লেখক: সাকিল মাসুদ
১৭শ শতকের শেষভাগ থেকে ১৮শ শতকের সূচনালগ্নে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তন ঘটে। মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ধীরে ধীরে ঢিলে হয়ে পড়ায় প্রাদেশিক শাসকরা কার্যত স্বাধীনভাবে শাসন পরিচালনা করতে শুরু করে। এই প্রেক্ষাপটে নবাবি আমলের গোড়াপত্তন হয়। মুর্শিদকুলি খান থেকে শুরু করে শুজা খান, আলিভর্দি খান ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার শাসনামলের মধ্য দিয়ে রংপুর প্রশাসনিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়ে উঠেছিল।
শুজা খানের শাসনামলেই (মাতামুল মুলক শুজাউদ্দিন বাহাদুর আসাদ জং) রংপুরের প্রশাসনিক কার্যবিধি অধিক গুরুত্ব পায়। তিনি তাঁর প্রধান উপদেষ্টা হাজী আহমেদের পুত্র সৈয়দ আহমেদকে রংপুরের ফৌজদার নিযুক্ত করেছিলেন। এই ফৌজদারের দায়িত্ব ছিল একদিকে সামরিক পদাধিকার পালন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বা নিয়ন্ত্রণ করা। অন্যদিকে জেলা তথা অঞ্চলের কর আদায় ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও ছিল ফৌজদারের দায়িত্ব। সৈয়দ আহমেদের নেতৃত্বে রংপুরে মোগল প্রশাসনের কঠোরতা এবং বিচারিক ব্যবস্থা বজায় থাকে এবং বিশেষ করে স্থানীয় জমিদার ও প্রজাদের মধ্যে সুশৃঙ্খলতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়।
রংপুরের জমিদারি কাঠামো ও রাজস্বনীতি:
নবাবী আমলে রংপুর অঞ্চলের অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি জমিদার রাজস্ব প্রদানে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের অনেককে বন্দি করা হয়েছিল। এমনকি তৎকালীন সময়ে খাজনা অনাদায়ে জমিদার শ্রেণি কর্তৃক প্রজাদের ওপর অত্যাচারের বিষয়টিও ছিল বিধিসম্মত। পরবর্তীতে শুজা খান শাসন গ্রহণের পর এই জমিদারদের মুক্তি দেওয়া হয়, তবে তাদের ওপর শর্ত আরোপ করা হয়েছিল, ভবিষ্যতে নিয়মিত খাজনা প্রদানের। এই নিশ্চয়তার ফলে জমিদাররা মুক্তি পেলেও এ অঞ্চলের কৃষকদের ওপর নেমে এসেছিল চিরস্থায়ী শোষণের নতুন বন্দোবস্ত। যার প্রমাণ মেলে ১৯৪৬ সালের তেভাগা আন্দোলনেও। ইতিহাস থেকে বোঝা যায়, নবাবি আমলের নীতি শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কাঠামোকেও দৃঢ় করেছিল।
নবাবী আমলের এই সিদ্ধান্ত শোষণের হাতিয়ার হলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি ছিল শুধু উদারতা নয়, বরং শাসন পরিচালনায় এক দূরদর্শী আর্থিক নীতিও, যা রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করার জন্য গৃহীত। এই ব্যবস্থা থেকে তৎকালীন রংপুরের সমাজের নৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিস্কার চিত্র উঠে আসে।
এছাড়াও নবাবী আমলের শোষণনীতির পতনের পরও কৃষক অসন্তোষের ধারাবাহিকতা চলমান ছিল। যার প্রমাণ মেলে ইংরেজ আমলেও। কুচবিহার ১৭৭৩ সালে ব্রিটিশদের সাথে সামন্ততান্ত্রিক চুক্তিভুক্ত হয়েছিল। ১৭৭২ সালে ভুটান যখন কোচবিহারে আক্রমণ করে তখন কুচবিহার রাজা সাহায্যের জন্য আবেদন করলে ব্রিটিশরা একটি বাহিনি পাঠালেন। ভুটান পরাজিত হয়। পরে ১৭৭৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে ভুটানের শান্তিচুক্তি হয়। ১৭৮৩ সালে ক্যাপ্টেন টার্নারকে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ভুটানে নিযুক্ত করা হলে, তিনি সে মিশনে ব্যর্থ হন। রংপুর, কোচবিহার ও ভুটানের সাধারণ মানুষের সােথ ইংরেজদের নানান চড়াই উৎরাইয়ের ফলে মি. হান্টারও তার বইয়ে উল্লেখ করেন- জলপাইগুড়ি ছিল ব্রিটিশদের অবাধ্য শহর রংপুরের একটি অংশ। তিনি বলেন- ‘In that year a part of the sub-montane strip, taken from Bhutan in 1865, was united with a corner of our old unwieldy District of Rangpur, and formed into a new admihistrative unit.’। এছাড়াও তিনি এখানকার অধিবাসীদের ‘primitive hill-tribes’ বলে উল্লেখ করেন।
যদিও ফসল উৎপাদনে সমৃদ্ধ ছিল এই অঞ্চল তবুও ত্রিদেশ বদলেরও পরও উন্নয়ন কাঠামো আজও অবহেলিত।
রংপুরের রাজনৈতিক ভূগোল ও কৌশলগত গুরুত্ব:
উত্তরবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে রংপুর ছিল উত্তর ভারত থেকে আসা সম্ভাব্য আক্রমণের প্রতিরোধক। এটি পাটনা, ভাগলপুর ও রাজশাহী অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত থাকলেও, আসাম ও ভূটানের সঙ্গে যোগাযোগের মূল সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতো। কারণ ছিল, সামাজিক সাংস্কৃতিক ও জাতিগত মিল। সৈয়দ আহমেদের মতো দক্ষ ও বিশ্বস্ত ফৌজদারের নিয়োগ এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্বের প্রমাণস্বরূপ।
সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট:
নবাবি আমলের রংপুরে শিক্ষাবিস্তারের সরাসরি প্রভাবের বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য ও প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায়নি, তবু শুজা খানের দানশীল ও জ্ঞানপ্রেমী শাসনের নীতির ছাপ প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলোতে লক্ষ্য করা যায়। তিনি ফৌজদারদের মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় মাজার কেন্দ্রগুলিকে সাহায্য প্রদান এবং সুরক্ষা নিশ্চিতের বন্দোবস্তো করতেন।
রংপুরের জন্য আদালত ব্যবস্থা: রেগুলেশন V ও XVII, 1793:
১৭৯৩ সালের রেগুলেশন V অনুযায়ী, মুর্শিদাবাদ শহর এবং মুর্শিদাবাদ, ভাগলপুর, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর ও কুচবিহার জেলা পর্যায়ের একটি প্রাদেশিক আপিল আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। রেগুলেশন XVII অনুযায়ী, যদি শহর বা জেলা আদালতে কোনো অভিযোগ থেকে বোঝা যায় যে উভয় পক্ষই নওয়াব নাজিমের চাকর, আত্মীয়, অথবা সাবেক বাংলার নাজিমদের বিধবা বা নারী উত্তরসূরি, তাহলে তারা সরাসরি নওয়াব নাজিমের কাছে বিচারার্থে পাঠানো হতো।
নবাব শুজা খানের শাসনামলে রংপুর প্রশাসনিক ও সামরিক উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অধিকার করে। সৈয়দ আহমেদের মতো বিশ্বস্ত প্রশাসক নিয়োগ এই অঞ্চলের সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষা ও রাজস্ব ব্যবস্থার কার্যকরতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হয়। জমিদারদের মুক্তি দেওয়া, নতুন দায়িত্ব বণ্টন এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো ছিল কৌশলী ও মানবিকভাবে গ্রহণ করা। রংপুরের ইতিহাসে এটি এক উজ্জ্বল অধ্যায়, যা নবাবি আমলের প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি, নীতি এবং আঞ্চলিক গুরুত্বের সঙ্গেই সংযুক্ত।
তথ্যসূত্র:
- The Musnud of Murshidabad (১৯০৫), পূর্ণচন্দ্র মজুমদার,
- A Statistical Account of Bengal (1876), W. W. hunter, B.A., LL.D.
Views: 0