কবি তাসমিন আফরোজ রেখে গেলেন জোছনাময় ঘরবাড়ি, ফাগুন বনের কবিতা

0 Comments

কবি তাসমিন আফরোজ ফেসবুক টাইমলাইনে শেষবার একটি কবিতা পোস্ট করেছিলেন ১২ মার্চ ২০২২খ্রি-
‘আয়ুষ্কাল’
‘সমগ্র রচনাবলীর চতুর্থ পর্বে তীব্র স্বরে উথলে উঠেছে গতিশীল কান্না-
ঢেউ খেলে যাচ্ছে এবাড়ি-সেবাড়ি;
নিশ্চিন্তে মনে অবাধ হাওয়ায় বহুভাষী রোদের সাথে ঝলমল করে ওঠে পালঙ্কে থাকা মুঠো
আয়ুর পাণ্ডুলিপিতে দেহ আর মন-
সবকিছু সুন্দর পরিপাটি নয়
কখনও কোমল গান্ধার-
কখনও মায়াস্বর্ণ মেখে অনন্ত আদর
এভাবেই এগিয়ে যায় দিন
এগিয়ে যায় রাত, জোনাকির আইরেঞ্জের আলো –
পরের পরতে নেশা মাখছে ছাতিমঘ্রাণ-
ভেঙে গেলো রেশমি চুড়ি, বেলফুলের পাপড়ি, চন্দ্রোদয় মেশানো প্রাণ-
তবুও এই আমি বিবর্তনে পৃথিবীর উঠোনে তুলে রাখি জ্যোস্নাময় ঘরবাড়ি, ফাগুন বন,
তোমাদের জন্য নিরব ভূমিকায় ভালোবাসার ক্ষণ…’

জীবনের অনেক কাজ অসমাপ্ত রেখে বিদায় নিয়েছেন কবি তাসমিন আফরোজ। অসময়ে চলে গেলে আমাদের জন্য রেখে গেলেন- জোছনাময় ঘরবাড়ি, ফাগুন বনের আবহে লেখা কবিতা।
রংপুরের যে কয়েকজন কবি-লেখক আমার পছন্দের তালিকায়, তাঁদের একজন ছিলেন কবি তাসমিন আফরোজ। তাঁর কবিতায় যেমন ফুটে ওঠে জীবনের পরাবাস্তবতা, যাপনচিত্র, উত্থান-পতন, তেমনি ফুটে ওঠে প্রকৃতির গান, দেশপ্রেম। মানুষ হিসেবে তিনি যেমন কোনোরকম ভনিতা বা বেশ ধরা পছন্দ করতেন না, কবি হিসেবেও করতেন না।
তাঁকে খুব সহজে আর মানুষগুলো থেকে আলাদা করা যেত বিশেষ কিছু গুণের কারণে। তিনি খুব ভালো কবিতা লিখতেন। ছিলেন একজন মায়ময় মানুষ, খুব সহজে ভালোবাসতে পারতেন মানুষকে। ছিলেন মিশুক, অনায়াসেই মিশে যেতেন মানুষের সাথে।
কবি তাসমিন আফরোজ এর ডাক নাম নিশিদা। তাঁর মেয়েবেলা ছিল কবি ও কবিতায় বসবাস। তিনি বেড়ে উঠেছেন পারিবারিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। কবিতা নির্মাণ, আবৃত্তি আর উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে আশির দশকে মঞ্চ ও বেতারে সদা বিচরণ তাঁকে পরিচিতি দিয়েছে, প্রশংসিত করেছে। কবি এসব প্রতিভার কারণে শিক্ষা জীবনেই অসংখ্য পুরস্কার প্রাপ্ত হয়েছিলেন। একসময় ছাত্র জীবনে নৃত্যশিল্পী ছিলেন, পেয়েছিলেন জাতীয় পুরস্কারও। বিতর্ক প্রতিযোগি ছিলেন। বাংলাদেশ বেতারের সক্রিয় আবৃত্তিশিল্পী ছিলেন৷ লিখেছেন ছোটোগল্প ও কবিতা। ৯৭ সালে ‘চলতিপত্র’ পত্রিকায় প্রকাশিত ছোটোগল্প শ্রেষ্ঠগল্প হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল৷ এছাড়া রাঁধুনী আয়োজিত রান্নার প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলেন ২০০৭ সালে। ছিলেন সমাজসেবক।
জীবদ্দশায় তাঁর জীবনসঙ্গী ছড়াকার রকিবুল হাসান বুলবুলের সহযোগিতা অমর একুশে বইমেলায় আইডিয়া প্রকাশন থেকে দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হয়। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হলুদ মোহ উড়ন্ত শাড়ি ২০১৭’ এ বইটির মোড়কউন্মোচন করেছিলেন তৎকালীন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি, দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘জল ফড়িঙের ডানা ২০১৮’ পাঠকের কাছে ব্যাপক সমাদৃত।
তাঁর অকাল প্রয়াণের কিছুদিন আগেও আমার সাথে একাধিকবার কথা হয়েছিল মোবাইলে। তিনি স্বামী ছড়াকার রকিবুল হাসান বুলবুল এর মৃত্যুতে খুব বেশি একা হয়ে পড়েছিলেন। যা কাউকে বুঝতে দিতেন না। বেশি ভাবতেন, সময়ের, জীবনের নানান টানাপোড়ন নিয়ে, ছেলেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তাঁর লেখালেখি প্রসঙ্গে একদিন তিনি বলেছিলেন, ‘ভাইয়া কোভিডের কারণে পিছিয়ে গেলাম। এ বছর (২০২৩) এর বইমেলায় একটা বই প্রকাশ করতে হবে। পাণ্ডুলিপি রেডি করছি…’। তিনি বয়সে আমার বড়ো হলেও আমাকে নাম ধরে ডাকতেন না। তিনি ছোটো বড়ো সকল মানুষকে শ্রদ্ধা করতেন।’
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশুনা করলেও মানুষের মনোজগৎ নিয়ে লেখালেখি করতে আনন্দ বোধ করতেন তাসমিন আফরোজ। এক সময় বিতর্ক মঞ্চে ছিল তাঁর সাবলীল উপস্থিতি। দীর্ঘ তেত্রিশ বছর দেশের নানা প্রান্তে বসবাসের সুবাদে অর্জন করেছেন রূপ ও অরূপের বিস্তীর্ণ অভিজ্ঞতা। বর্ণিল জীবনে স্বকীয় কর্মকাণ্ডে তিনি বরাবরই উদ্ভাসিত ও সমুজ্জ্বল। রংপুরের সকল সাহিত্যানুষ্ঠানে ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। সাহিত্যচর্চা নিয়েই তাঁর আনন্দময় সময় কাটতো।
সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনকালে তিনি সবসময় ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান কর্মী। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন ফিরেদেখা সংগঠনের সহসভাপতি হিসেবে । ফিরেদেখা’র যে কোনো অনুষ্ঠানে বা মিটিংয়ে তিনি উপস্থিত হতেন নির্ধারিত সময়ে, কাজ করতেন নিজ দায়িত্ববোধ থেকে। এছাড়াও বিভিন্নভাবে যুক্ত ছিলেন, স্বর্ণ নারী এসোসিয়েশন, বেগর রোকেয়া নারী সংগঠন, বিভাগীয় লেখক পরিষদসহ আরও সংগঠনের সাথে। স্বামীর চাকরি সূত্রে ক্যাডেট কলেজের অফিসারদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি, হয়েছেন সম্মানিত এবং প্রসংসিত৷ জীবনের সকল পর্যায়ে কুড়িয়েছেন অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা।
তাঁর পিতা ছিলেন আজিম উদ্দিন আহামেদ ও মাতা দৌলতুন্নেসা খাতুন। ৫ ভাই তিন বোনের মধ্যে কনিষ্ঠ সন্তান। ছোটোবেলা থেকেই সবার স্নেহের ছিলেন। ১৯৭৭ সালের দিকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন প্রয়াত ছড়াকার উপাধ্যাক্ষ রকিবুল হাসান বুলবুলের সাথে।
পড়াশুনা করেছেন আদর্শ গার্লস হাই স্কুল রংপুর থেকে (এসএসসি), কার্মাইকেল কলেজ থেকে (এইচএসসি) ও (অনার্স- পলিটিক্যাল সাইন্স) ৷
রংপুরে ধাপ কাকলী লেনে আজলত কটেজ ছিল পিতার বাড়ি।
মৃত্যুকালে তিনি ২ ছেলে, ১ ছেলের বউ ও বহু শুভাকাঙ্ক্ষি রেখে যান। বড়ছেলে লেখক রিয়াসাত হাসান জ্যোতি, বড় ছেলের বউ কথাসাহিত্যিক ও চলচিত্র নির্মাতা মুর্শিদা জামান এবং ছোটোছেলে তানজীম হাসান দীপ্ত। আর অসংখ্যা স্বজন।
তিনি ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৩ রংপুর মহানগরে জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যুর আগের দিনগুলোতে নিউসেন পাড়ার ভাড়া বাসায় থাকতেন। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন, নিউমোনিয়ার কারণে পরবর্তীতে সেপটিক শকে আক্রান্ত হন। গত ২৭ জুন ২০২২ খ্রি. ঢাকার কুর্মিটোলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

লেখক: সাকিল মাসুদ, সম্পাদক, প্রকাশক ও সাধারণ সম্পাদক, ফিরেদেখা

Categories:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *