তাইওয়ানের আধুনিক কবিতা: পটভ‚মি ও ইতিহাস প্রসঙ্গ
তাইওয়ানে আধুনিক কবিতার ঐতিহাসিক সূচনা ঘটেছিল ১৯৪৫ সালে জাপানিদের আত্মসমর্পণের পর চীন প্রজাতন্ত্রে দ্বীপটির প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বা আরো প্রাসঙ্গিকভাবে বলা যায়, ১৯৪৯ সালে চ্যাং কাই-শেক যখন থেকে তাঁর সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের অবশিষ্টাংশ নিয়ে চীনের মূল ভ‚খÐ ছেড়ে তাইওয়ানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পূর্ববর্তী সময়ে চীনা ও জাপানি সাহিত্যের প্রভাব যে তাইওয়ানের সাহিত্যের ওপর পড়েনি, তা নয়- আসলে এটি অনুসন্ধানের বিষয়- তবে সেই সময়ের ঐতিহাসিক পরিস্থিতি তাইওয়ানের সাহিত্যের ধারাবাহিকতাকে সরাসরি ব্যাহত করেছিল। কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা ছাড়া, তাইওয়ানের কাব্য-সাহিত্যের ঐতিহ্যের পুনরাবির্ভাব হতে আরো বিশ বছর লেগেছিল।
১৯৪৬ সালের পর চীনের জাতীয়তাবাদী সরকার চীনা সংস্কৃতি ও ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার একটি নীতি প্রয়োগ করে, যার অর্থ তাইওয়ানিজ ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে জাপানি প্রভাবগুলো কার্যকরভাবে অপসারণ করা। এতে করে চীনা প্রশাসনের সরকারি সংস্কৃতি তাইওয়ানিদের মধ্যে একটি নতুন ফাটলের মুখ খুলে দেয়, যেমনটি ১৯৩৬ সালের পর জাপানিরা তাদের একচেটিয়া সাংস্কৃতিক প্রভাব চাপিয়ে দ্বীপটির মানুষের জীবন, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ফাটল তৈরি করেছিল।
ঐ সময়, যাঁরা তাইওয়ানে আধুনিক সাহিত্য ও কবিতার বিকাশে অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করেছিলেন, তাঁরা সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন চীনা সাহিত্য ও সংস্কৃতির সংগ্রাম, সমস্যাসহ উত্তরাধিকার। এর মধ্যে প্রধান ছিল জাতীয়তাবাদী ও কমিউনিস্টদের মধ্যে চলমান গৃহযুদ্ধ এবং জাপানের সাথে তৎসময়ে সমাপ্ত বিরোধ। তাইওয়ানের আধুনিক কবিতা উত্তরাধিকার সূত্রে এই আন্দোলন, সংগ্রাম, সমস্যা ও সম্ভাবনাসহ কবিতার ভাষা, রূপ, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সত্তার অস্তিত্ব নিয়ে এগিয়ে এসেছে। তাইওয়ানে, ১৯৪২ সালে শিল্প ও সাহিত্যের প্রসারণের জন্য কগঞ (চীন প্রজাতন্ত্র, তাইওয়ানের একটি রাজনৈতিক দল) প্রোগ্রাম অনুসারে এবং তার সৈন্যদের মনোবল বজায় রাখার জন্য সেনাবাহিনী একটি সক্রিয় সাংস্কৃতিক পরিসেবা স্থাপন করে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি এটি তাইওয়ানের জনগণের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে কাজ করতে চেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন কবিতার জন্য, যেখানে সংবাদপত্রকে ব্যবহার করে বহুমুখী স্লোগান-সর্বস্ব সাহিত্য তৈরির প্রচেষ্টা চলে; যা ছিল বাস্তবতাবঞ্চিত। সেই সময়ের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশটাই ছিল ভয়াল, গুপ্তচরীয় স্বেচ্ছাচারী এবং পুলিশি পদক্ষেপে ভরা।
এ ধরনের সরকারি মদদপুষ্ট পরিবেশে জনগণের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এর প্রতিবাদে তাইওয়ানের কবিতায় বেরিয়ে আসে নতুন মুখ। এই আন্দোলনে নেতৃত্বে চলে আসেন, যাঁরা চীন-জাপান যুদ্ধের আগে সাহিত্য আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন: চ’ইন জু-হাও, যিনি ক্রিসেন্ট মুনের সাথে জড়িত ছিলেন, তিনি একটি সাহিত্য সম্পূরক কাব্যসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন, যাকে তিনি বøæ স্টার নামে অভিহিত করেছিলেন; চি হসিয়েন, যিনি সাংহাইতে দাই ওয়াংশুর নেতৃত্বে নতুন কবিতা আন্দোলনের ‘Modernist school’ গ্রুপে অংশ নিয়েছিলেন, ১৯৫২ সালে ‘নিউ পোয়েট্রি জিন শি’ নামে একটি জার্নাল চালু করেছিলেন, যা তারপরে ১৯৫৩ সালে জিয়ানডাই শি নাম ধারণ করে। এই জার্নালের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল দাই ওয়াংশুর কবিতাবিষয়ক চিন্তা ও লক্ষ্যগুলো অব্যাহত রাখা।
কবিতা বিষয়ে দাই ওয়াংশুর মূল কথা হচ্ছে: ‘আধুনিক জীবনে আধুনিক মানুষের দ্বারা অনুভ‚ত আধুনিক আবেগকে আধুনিক ভাষায় আধুনিক কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে।’ কাব্যিক ফর্মের বিষয়ে চি হসিয়েন কিছু স্পষ্ট অভিমত প্রণয়ন করেছিলেন, যা তাইওয়ানে কবিতার প্রাথমিক বিকাশে খুব কার্যকার প্রভাব ফেলেছিল। তিনি মনে করতেন, ‘কবিতা সংগীতের সাথে শৃঙ্খলিত নয়; কবিতাকে অবশ্যই মুক্ত হতে হবে।’ তার মতে, ঊনবিংশ শতাব্দীতেই কবিতা তার স্বাধীনতা অর্জন করে তাঁর অস্তিত্ব থেকে সংগীতকে বিদায় জানিয়ে গদ্য ভাষায় ফিরে এসেছে। তাই, চি হসিয়েন উপসংহারে পৌঁছেছেন, কবিতায় প্রচল নিয়ম, ছন্দ ও অন্তঃমিল পরিত্যাগ করা প্রয়োজন। কবিতার প্রতিটি প্রাক-অস্তিত্বশীল ফর্ম ভেঙে ফেলার পক্ষপাতী তিনি; কবিতা শুধু তার বিষয়বস্তু দ্বারা নির্ধারিত হবে।
এর অব্যবহিত পরেই চি হসিয়েন কবিতা নির্মাণের ক্ষেত্রে আরো বেশি মৌলিক অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি পশ্চিমাকরণের প্রবণতাকে চরমভাবে গ্রহণ করেছিলেন, যা চীনের ‘মে ফোর্থ আন্দোলন’-এর (‘মে ফোর্থ আন্দোলন’ ছিল একটি চীনা সাংস্কৃতিক ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন, যা বেইজিং-এ ৪ মে, ১৯১৯-এ ছাত্রদের বিক্ষোভের ফলে বেড়ে ওঠে) সাথে আবিভর্‚ত হয়েছিল। ১৯৫৬ সালের ফেব্রæয়ারিতে তাঁর ‘আধুনিক কবিতা’ নামের ইশতেহার বিশ^ব্যাপী আধুনিকতাবাদী কবিতার প্রবণতাগুলোর প্রেক্ষাপটে তাইওয়ানিজ কবিতাকে নতুন মাত্রায় উচ্চকিত করে তোলে। এই ইশতেহারে প্রথম প্রবন্ধে ঘোষণা করা হয়েছিল, ‘আমরা আধুনিকতাবাদী স্কুলের অন্তর্গত একটি দল, যারা ফ্রান্সের কবি চার্লস পিয়েরে বউডেলেয়ারের পর থেকে বিকাশ লাভ করা সমস্ত উদ্ভাবনী কাব্যিক বিদ্যালয়ের চেতনা এবং কাব্যিক অনুশীলনকে বাঁচিয়ে রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’ তাঁর জার্নাল এইভাবে বউডেলেয়ার থেকে সমস্ত আন্তর্জাতিক কাব্যিক আন্দোলনের একমাত্র উত্তরাধিকার হিসেবে দাবি তোলে। তাঁর এই পাশ্চাত্যকরণের কণ্ঠে প্রাচীন ও আধুনিক চীনা ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যানের ধ্বনি উঠে আসে।
ইশতেহারের দ্বিতীয় নিবন্ধে এই অবস্থানের সংক্ষিপ্তসার একটি সূত্র দিয়ে করা হয়েছিল, যা একটি জোরালো প্রতিক্রিয়ার উদ্রেক করতে বাধ্য : ‘আমরা বিশ্বাস করি যে নতুন কবিতা একটি অনুভ‚মিক প্রতিস্থাপন, উল্লম্ব উত্তরাধিকার নয়।’ এই দ্বিতীয় নিবন্ধ সবচেয়ে বড় বিতর্ক তুলেছিল। একটি আন্তর্জাতিক আধুনিকতার পক্ষে চীনা ঐতিহ্যের সমস্ত কিছু পরিত্যাগ করার ঘোষণা হিংসাত্মক বিতর্ককে উসকে দেয়। ‘অনুভ‚মিক প্রতিস্থাপন’কে চীনা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সমাপ্তি হিসেবে দেখা হয়েছিল। এই ক্ষোভ সত্তে¡ও চি হসিয়েন তাঁর ইশতেহারের একটি মন্তব্যে জোর দিয়েছিলেন যে, “আমাদের নতুন, সর্বজনীন কবিতা তাং কবিতা বা সুং ব্যালাডের মতো ‘জাতীয় সারাংশ’ এর প্রকাশ নয়।”
রক্ষণশীলদের দ্বারা এড়িয়ে যাওয়া চি হসিয়েন তৎকালীন তরুণ কবিদের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে শতাধিক পশ্চিমা ঐতিহ্য ধারণ করা কবি মডার্নিস্ট স্কুলের ব্যানারের আওতায় চলে আসেন, যেমন ফ্যাং সু (তিনি বিশেষ করে তাঁর রিল্কে অনুবাদের জন্য পরিচিত), বেশ কিছু স্থানীয় তাইওয়ানি কবি, যেমন পাই চিউ এবং লিন হেং-তাই, যাঁরা জাপানি ঔপনিবেশিক কালে শিক্ষিত হয়েছিলেন এবং চীনা ভাষায় খুব পারঙ্গম ছিলেন না কিন্তু জাপানি সংযোগের মাধ্যমে বিদেশি কবিতার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন এবং অন্যান্য তরুণ কবি, যাঁরা শেষ পর্যন্ত চীনা ঐতিহ্যের প্রতি সংবেদনশীল থেকেও এই নতুন ইশতেহারকে গ্রহণ করেছিলেন, যেমন কবি চেং চ’উ-ইউ।
সন্দেহ নেই যে, ‘আধুনিক কবিতা’র এই ইশতেহারের উৎসাহী অভ্যর্থনার একটি কারণ ছিল। এটি এমন এক প্রকার সাহিত্যের জন্য আহ্বান, যা ছিল ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেকে শিকড়হীন ভাবার এক অভিনব প্রয়াস, যার মাধ্যমে পশ্চিমের দর্শনগত বিমূর্ত দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছিল; এবং আধুনিক নারী-পুরুষের কাছে এটি একটি স্টাইলের অংশ, কারণ তারা অনুভব করতে পারছিল, কেবল প্রতিভা এবং কল্পনার ওপর নির্ভর করে কবিতায় একটি নতুন জগৎ তৈরি হতে পারে।
তাইওয়ানের জনগণ ও কবিদের মধ্যে বেদনা কাজ করত এই ভেবে, যারা সাংস্কৃতিকভাবে উন্নত ছিল তারাই নির্বাসনের পরিণতি ভোগ করেছে, তাদের জন্মভ‚মির মূল আয়োজন ও শেকড়ের মানসিক বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নানা অবদমনের মধ্যে তাইওয়ানের এমন পরিস্থিতিতে পশ্চিমা কাব্যচিন্তার একটি নির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনপ্রবাহ কবিদের স্বস্তি দিতে সক্ষম হয়েছিল তৎকালীন সময়ে। হয়তো কবিরা বুদ্ধিবৃত্তিকে কল্পনায় জড়িয়ে অপছন্দের শাসনব্যবস্থাকে সহ্য করার একটা কৌশল খুঁজে পেয়েছিলেন এই কবিতা আন্দোলনের মধ্যে। মূলত তাইওয়ানের আধুনিক কবিতার বিকাশের জন্য সক্রিয় শর্ত ছিল সৃজনশীলতাকে একটি শুদ্ধ কবিতায় কেন্দ্রীভ‚ত করা, যা প্রভাবশালী মতাদর্শের বিরোধিতা করে স্বতন্ত্র অনুভ‚তি প্রকাশের অনুমতি দেয় এবং রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেÑ শৈল্পিক সৃষ্টির মাধ্যমে।
এই কবিতা আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় কবিরা এই স্কুলকে নান্দনিক শৈলী বিকাশের প্রচেষ্টায় ইউরোপীয় অনুসরণ, অনুকরণ ও অনুপ্রেরণায় নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে থাকে। তবে কবিতার থিমে ঘুরেফিরে নির্বাসন, নস্টালজিয়া ও একাকিত্বের দুঃখজনক অনুভ‚তি পরিস্ফুট হত; আর সেগুলোকে তাঁরা কবিতার ভাষায় আবেগপ্রবণ ও স্বাধীন চিত্তে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
যদিও এই স্কুল কয়েক বছর পর বিলুপ্ত হয়ে যায়, চি হসিয়েনের প্রস্থান ঘটে চীনা কবিতার রসায়নে আত্মবিশ্বাসী অতি বুদ্ধিবৃত্তিক ইউরোপীয় ধারা প্রবর্তনে। তবু তাইওয়ানের কবিতা তাঁর এই স্বাধীন চিন্তার স্ফুরণে স্বকীয় পরিচয় লাভ করে। কবিতায় প্রাধান্য পায় বৌদ্ধিক বিষয়বস্তুর জন্য উদ্বেগ, আবেগপ্রবণতা, প্রত্যাখ্যান, অভিব্যক্তির প্রতি যতœশীল মনোযোগ এবং ভাষার ঘনীভ‚ত ব্যবহারের কারুকাজ।
চি হসিয়েনের বুদ্ধিবৃত্তিকতা, কবিতায় সে প্রসঙ্গের ‘আনুভ‚মিক প্রতিস্থাপন’ এবং সাধারণভাবে আধুনিকতাবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে, ব্লু স্টার সাহিত্যের সম্পূরক সম্পাদক চ’ইনৎজু-হাওকে কেন্দ্র করে একটি দল গড়ে ওঠে, যার উদ্দেশ্য ছিল গীতিকবিতার ঐতিহ্য বজায় রাখা। তারা পুরো চীনা ঐতিহ্য প্রত্যাখ্যান না করে প্রাচীন ধ্রুপদী রীতির ঐতিহ্য গ্রহণ করতে চাইলেন; যেমন ১৯২০-এর দশকে তাইওয়ানের কবিতায় চীনা ঐতিহ্য সঙ্গে নিয়ে ক্রিসেন্ট মুনের কবি ওয়েন ইডুও এবং জুঁ ঝিমো অগ্রসর হয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, যারা ব্লু স্টারের চারপাশে জড়ো হয়েছিল, তারা একটি সংগঠিত আন্দোলনের চেয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক দলের মতো ছিল। এর একটি নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ইয়াং, দলটিকে সাহিত্যিকদের ‘বৈঠকখানা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিষয়টি কবি ইয়ু কোয়াং-চুং তাঁর স্মৃতিচারণে তুলে ধরেন এভাবে : ‘আমরা কখনোই এই বৈঠকখানার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করিনি, এমনকি আমরা একটি ইশতেহার জারিও করিনি বা কোনো ‘ইজম’ বা অন্য কিছু ঘোষণা করিনি। সামগ্রিকভাবে আমাদের জমায়েতগুলো চি হসিয়েনের বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া ছিল মাত্র। তিনি সমসাময়িক ইউরোপীয় কবিতাকে চীনের মাটিতে প্রতিস্থাপন করতে চেয়েছিলেন এবং আমরা তার সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলাম। তাই আমরা অন্ধভাবে তাঁর কাজের ‘অনুভ‚মিক প্রতিস্থাপন’ মেনে নিতে পারছিলাম না। যদিও আমাদের মিশনের মূল উদ্দেশ্য শুধু চীনা কাব্যিক ঐতিহ্যের স্থায়িত্বের পুনর্বিবেচনাকরণ ছিল না, আমরা চেয়েছিলাম তাইওয়ানের কবিতার স্বতন্ত্র মুখশ্রী।’
তাইওয়ানের কবিতার বিকাশে ‘বøæ স্টার’ গোষ্ঠীর অনস্বীকার্য ভ‚মিকা ছিল এর সদস্যদের ব্যক্তিত্ব এবং তাদের কাজের গুণমানের কারণে শুধু তার তাত্তি¡ক অবস্থানের জন্যই নয়। তা সত্তে¡ও, আধুনিকতাবাদীদের সাথে ঠোকাঠুকি, তর্কবিতর্ক শুরু হয়, প্রায়শই তাদের কেন্দ্রে ইউ কোয়াং-চুংয়ের সঙ্গে ছন্দশাস্ত্রের গুরুত্ব, শ্লোক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা, নতুন স্থিতিশীল ফর্ম তৈরি নিয়ে উদ্বেগ ও ঐতিহ্যের ভ‚মিকার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ ও তর্ক হত। তবে, বেশ কয়েকটি আলাপে ইউ কোয়াং-চুং ক্লাসিকবাদের প্রবক্তাদের বিরুদ্ধে দৃঢ়তার সাথে নতুন কবিতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, যা, পরবর্তী দশকগুলোতে, এমনকি এখনো বুদ্ধিজীবীর মনন প্রতিষ্ঠায় প্রভাবশালী প্রতিনিধিত্ব করছে।
বøæ স্টার আধুনিক কবিতার প্রভাবকে প্রসারিত করার ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করতে থাকে, তা একক লেখকের প্রকাশনা এবং সংগৃহীত রচনার মাধ্যমে অথবা দলগত আবৃত্তি ও জনসাধারণের পাঠের আয়োজনের মাধ্যমে। এই কার্যক্রমই তরুণ প্রজন্মকে নতুন কবিতা উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে।
যাই হোক, বøæ স্টার গ্রæপের কবিরা, যাঁরা পশ্চিমা কাব্যতত্ত¡ আমদানির প্রক্রিয়ার বাইরে এসে তাইওয়ানের কবিতার আধুনিকতা অনুসন্ধান করার জন্য সর্বোত্তম প্রচেষ্টা করেছিলেন এবং সর্বাধিক বিবেচনার সাথে চীনা ঐতিহ্যের স্বাদ বজায় রেখেছিলেন, তাঁরাই প্রথম পুনঃপ্রথা চালু করেছিলেন শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যের ব্যাখ্যায়। এ কারণে আধুনিক কবিতার গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে তাঁরা সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছেন।
একটি নির্ণায়ক অবদান রাখার জন্য তৃতীয় জার্নালটি ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয় ‘চুয়াংশিজি’ নামে (এই পত্রিকার ভাবার্থ হচ্ছে জেনেসিস বা সৃষ্টি)। আধুনিক কবিতা এবং বøæ স্টারের পরে এই জার্নাল ১৯৬০-এর দশকে তাইওয়ানের কবিতাকে একটি নতুন প্রেরণা দেয়।
‘চুয়াংশিজি’ পত্রিকাটি মূলত তিন যুবক-লো ফু, ইয়া হসিয়েন এবং চ্যাং মো প্রকাশ করেছিলেন; যাঁরা সেই সময়ে নৌ অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল ‘নতুন কবিতায় দেশ-জাতির ঐতিহ্যিকজাতীয় নির্দেশনা তুলে ধরা।’ সেই অর্থে ব্লু স্টারের মতো এটি ‘অনুভ‚মিক প্রতিস্থাপন’-এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ‘নতুন জাতীয় কবিতার রূপ’ শিরোনামের একটি নিবন্ধে নতুন জার্নালটি দুটি মানদÐকে সামনে তুলে আনে। এর মধ্যে প্রথম মানদণ্ডটি হচ্ছে : নতুন কবিতাকে হতে হবে অবশ্যই প্রাচ্যভিত্তিক এবং বিশেষভাবে চীনা বৈশিষ্ট্য পরিমÐিত স্বাদ থাকতে হবে কবিতায় এবং প্রাচ্যের মানুষের জীবন অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য চীনা ভাষার বিশেষ গুণাবলির সদ্ব্যবহার করতে হবে; দ্বিতীয় মানদণ্ডটি আরো কৌশলী ছিল : অনুভ‚তির কোনো বিশুদ্ধ মনস্তাত্তি¡ক বা মানসিক প্রদর্শন করা যাবে না। বিপরীতে, কবিতাকে অবশ্যই একটি অভিব্যক্তিপূর্ণ চিত্র ও অর্থবোধক হতে হবে। কবিতায় ভাবনা বা আবেগের তাৎক্ষণিক প্রকাশকে এই দলের কবিরা কেউ কেউ প্রত্যাখ্যান করতে চেয়ে দেখলেন, ইউরোপের কবিতায় তো অনেক আগেই ছন্দ ও অন্তঃমিল হারিয়ে গেছে। এমনকি কবিতার শরীর ভেঙে অনেকটা গদ্যের মতো হয়ে উঠেছে। তখন প্রশ্ন দেখা দিল, গদ্য থেকে পদ্যকে আলাদা করার কী বাকি থাকে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য ফ্রান্সের কবি বউডেলেয়ার তাঁর কবিতা ‘স্পিøন ডি প্যারিস’-এ প্রচেষ্টা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত খোলা প্রশ্ন রেখেছিলেন এবং যার উত্তর চি হসিয়েন খুঁজে পাননি, শুধু অনুভব করেছিলেন আধুনিক কবিতা একটা চিত্রমায়া। সম্ভবত এই চিত্রমায়া ও এর প্রতিফলনই এই দলকে পশ্চিমা আধুনিকতাবাদের ব্যানারে, এমনকি শেষ পর্যন্ত ‘অনুভ‚মিক প্রতিস্থাপন’-এর ব্যানারে নিজেদের স্থাপন করতে পরিচালিত করেছিল। তাই ১৯৫৯ সালে এই দল তাদের ‘নতুন কবিতায় নতুন বিপ্লব’ উসকে দেয়। যে মাত্রায় এঁরা নিজেদের একসময় জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে দেখেছিলেন, পরে এঁরাই নিজেদের সর্বজনীন কবিতার কণ্ঠস্বর হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। এই দ্বিতীয় পর্বে, যা ১৯৬০-এর দশকে ঘটেছিল, এই গোষ্ঠীর দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য দেখা দিল (যার অর্থ এই নয় যে এটি তাঁদের একমাত্র কার্যকলাপ ছিল), যথা পরাবাস্তবতা গ্রহণ এবং বিশুদ্ধ অভিজ্ঞতার কাব্যতত্ত¡ প্রণয়নের প্রচেষ্টা।
আন্দ্রে ব্রেটন কি কখনো জানতেন যে তাইওয়ানে, রুয়ে ফন্টেইন থেকে অনেক দূরে, সেখানে কবিরা তাঁদের পরাবাস্তববাদের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছিলেন? সেই সময়ে অন্তত তাইওয়ানের কবিরা তাঁর পরাবাস্তববাদী ইশতেহার তাঁদের হাতে পাননি। এক্ষেত্রে তাইওয়ানের কবি লো ফু লিখেছেন, “অবশ্যই, আমাদের কবিদের পরাবাস্তববাদী কাজগুলো ফরাসি পরাবাস্তববাদ বোঝার ফলে লেখা হয়নি এবং আন্দ্রে ব্রেটনের ‘ম্যানিফেস্টোস ডু সাররিয়ালিজম’ বা অন্যান্য পাঠ্য বা প্রতিবেদন পড়ার একক ফলও নয় আমাদের পরাবাস্তবাদী চর্চা। আমাদের কবিরা ফরাসি পরাবাস্তববাদীদের সাহিত্যকর্মসহ আরো বিস্তৃতভাবে অন্যান্য দেশের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল।”
এই পরাবাস্তববাদের অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি ছিলেন শ্যাং চ’ইন, যিনি গদ্য কবিতায় পারদর্শী ছিলেন। যদিও তাঁর গদ্য কবিতার প্রবণতা তৎকালীন কাব্য বিপ্লবের সামগ্রিক চাহিদাকে পূর্ণ করেনি, তবু এটি তাঁর অনুগামীদের যুক্তির সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করতে এবং সামাজিক ও নৈতিক রীতিনীতিগুলো ঝেড়ে ফেলতে সহযোগিতা করেছিল, অন্তত তাঁদের লেখায়, স্বপ্নকে বাস্তববাদের সাথে একত্রিত প্রকাশের বাঙ্ময়তা অর্জন করেছিল।
উপরন্তু, বহু বছর ধরে কাব্য রচনায় সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি ছিল চিন্তা, যার ওপর ভিত্তি করে কবিতার তীব্রতা এবং সেই সঙ্গে বোধোদয় উদ্ঘাটনের ক্ষমতা নিশ্চিত হয়ে এসেছে। চিন্তাকে ভাষার একটি অনুমানলব্ধ শূন্য ডিগ্রি; সাধারণ বক্তৃতার একেবারে সরাসরি ভাষা; এবং কবিতার শৈল্পিক ভাষার মধ্যে একটি ব্যবধান হিসাবে উপলব্ধি করা উচিত নয়, বরং কবিতায় চিত্র গঠনকারী শর্তগুলোর মধ্যে কাব্যিক প্রকরণের একটি শব্দার্থিক দূরত্ব হিসাবে বোঝা উচিত।
চিন্তার পাশাপাশি নমনীয় কোমলতার একটি কাব্যিক উপকরণ তৈরির মাধ্যমে মানসিক ভাবনার দরজা খোলার আরেকটি উপায় হচ্ছে বিশুদ্ধ অভিজ্ঞতার কবিতা, তাইওয়ানে যার প্রধান তাত্তি¡ক এবং সেরা অনুশীলনকারী হিসাবে পরিচিত ইপ ওয়াই-লিম। যদিও এই কাব্যিক কলাকৌশল চিত্রময়তার ওপর নির্ভর করে, বিশুদ্ধ অভিজ্ঞতার বাহ্যিক জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে। এটি সংবেদনগুলোকে ভাবনা থেকে আলাদা করার চেষ্টা করে, সেই মুহূর্তটিকে ধরে রাখতে যখন উপলব্ধির বস্তুগুলো তাদের সমস্ত তাৎক্ষণিকতায় সচেতনতার পৃষ্ঠে পৌঁছে যায় প্রতিনিধিত্বমূলক ভাষার অক্ষর বা প্রতিলিপির মধ্য দিয়ে।
তাইওয়ানের এই কাব্যিক অনুশীলনগুলো পরবর্তী সময়ে পলায়নবাদ, বিষয়বাদ এবং এমনকি নার্সিসিজমের জন্য সমালোচিত হয়েছে। এটা সত্য যে তাইওয়ানের কবিদের অন্তর্জগতের অনুসন্ধান এবং বিশুদ্ধ ভাবের ভাষা অনুসন্ধান তাঁদের কবিতায় প্রধান ভ‚মিকা পালন করেছে। এ বিষয়গুলো বাদেও এই দেশের কবিদের সহজাত প্রতিভা বিনষ্ট হয়েছে নানা ধরনের মনোবিকার, নির্বাসন, মূল ভূখণ্ডর শেকড় থেকে বিচ্যুতি, নিপীড়নমূলক শাসন, সর্বাত্মক মানবাধিকারের অভাবে। কবিদের মধ্যে উদ্বেগজনক যন্ত্রণা, উদ্বেগজনক অনুভ‚তি, হতাশা, আকাক্সক্ষা, একাকিত্ব, কারাবাস ও অসহায়ত্ব ভীষণভাবে তাদের মনের ওপর প্রভাব ফেলেছে এবং সেই প্রভাব নিয়েই তাইওয়ানের কবিতা গড়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে অস্তিত্ববাদী দর্শনও যুদ্ধোত্তর তাইওয়ানের কবিতায় ভীষণ প্রভাব ফেলেছিল। কবিরা যুদ্ধ ও মৃত্যুর ভয়ংকর চরম অভিজ্ঞতার স্মৃতি হৃদয়ে ধারণ করলেন। চারিদিকের এই পরিস্থিতি কবিদের শূন্যবাদের দিকেও ধাবিত করে।
যেমন লো ফু বলেছেন: ‘আপনার সামনে একটি আয়না ধরুন, দেখবেন আপনি আধুনিক মানুষের মুখ দেখতে পাবেন না, তবে তার ভাগ্যের নিষ্ঠুরতা দেখতে পাবেন। কবিতা লেখা যেন এই ভাগ্যের প্রতিশোধ নেওয়ার একটি উপায়।’ এই কবিদের অনেকের ভাষা অবশ্য দুর্বোধ্য ছিল, যে কারণে তাঁদের ভাষার জন্যও তাঁরা সমালোচিত হয়েছেন। এ ধরনের অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতা অনেকটা চলমান বৈরী জীবনের প্রতি ক্ষোভের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। তাঁরা অবশ্যই ভাষাকে তার সীমার মধ্যে রেখেই তাঁদের কাব্যিক প্রয়াস চালিয়েছেন এবং অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে তাঁরা আধুনিক চীনের জীবনবোধকে অস্তিত্বের গভীর অনুশীলন দিয়ে অনুভব করতে প্রয়াসী ছিলেন।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে একদল কবির কণ্ঠস্বর শোনা গেল, যাঁরা বিশেষভাবে তাইওয়ানিজ বলে নিজেদের দাবি করলেন। যাঁদের কবিতাবিষয়ক মুখপত্র ‘লি’ ১৯৬৪ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। এই ‘লি’ অর্থ ‘বাঁশের টুপি’। এই গ্রæপকে প্রায়শই ‘ত্রিপদী টুলের চতুর্থ পা’ বলা হয়, কারণ এটি তাইওয়ানের কবিতার বিকাশে ইতিমধ্যে উল্লিখিত তিনটি গ্রুপের চেয়ে কম নির্ধারক ভ‚মিকা পালন করেনি; একই সময়ে এটি কবিতায় নতুন এবং ভিন্ন ধারা নিয়ে আসে। লি দুটি আন্তঃসংযুক্ত ঘটনা ঘটায়; একটি সঠিকভাবে তাইওয়ানের সমষ্টিগত স্মৃতির পুনরুত্থান এবং দ্বিতীয়টি স্থানীয় পরিস্থিতির বাস্তবতার সাথে একটি সম্পৃক্ততার প্রতিনিধিত্ব স্থাপন করা। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এই আন্দোলন সম্পূর্ণরূপে তাইওয়ানে জন্মগ্রহণকারী স্থানীয় কবিদের নিয়ে গড়ে ওঠে। জার্নাল বা মুখপত্রের নামের মতো, তাদের মননের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার শেকড়টি দৃঢ়ভাবে প্রোথিত ছিল। যেমন-জার্নালটি বেশ কয়েক বছর পরে ঘোষণা করেছিল, ‘আমরা তাইওয়ানের প্রকৃত ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম। একই সময়ে আমরা আমাদের দ্বীপে মাতৃভ‚মিত্বের গৌরব ফিরিয়ে আনতে গিয়ে বছরের পর বছর অন্যদের তৈরি করা কৃত্রিম অস্থিরতার মধ্যে রয়েছি।’ লি জার্নালের সাথে যুক্ত চল্লিশ বা তার বেশি সদস্যদের মধ্যে কনিষ্ঠজন চীনা ভাষায় শিক্ষিত ছিলেন, তবে বয়স্ক সদস্যগণ ম্যান্ডারিন শিখে ‘ভাষার গ্যাপটা’ পূরণে সচেষ্ট হন। তাঁদের সাহিত্যিক অনুভব তৈরির মধ্য দিয়েই তাঁরা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন শুধু আধুনিক কবিতার পূর্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে এগোলেই চলবে না, কবিতায় শেড়রের সন্ধান জরুরি।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে ১৯৭০-এর দশকে এসে তাইওয়ানের কবিতা চীনা ঐতিহ্য এবং তাইওয়ানের বাস্তব পরিস্থিতির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে একটা নির্ভার নান্দনিক শৈলীর দিগন্ত উন্মোচন করে। ভ‚রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটগুলোও কবিতায় নতুন চেতনা তৈরিতে বিশেষ ভ‚মিকা পালন করেছিল।
১৯৭১ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক দিয়াওয়ুতাই (বা সেনকাকু) দ্বীপপুঞ্জ জাপানে প্রত্যাবর্তন দেশপ্রেমের একটি তরঙ্গ উসকে দেয়, বিশেষ করে ছাত্র বয়সের যুবকদের মধ্যে। এই প্রেক্ষাপটে তাইওয়ানিজরাও তাদের ভূখণ্ডর পূর্ণ মুক্তির স্বপ্ন দেখে। তবে চীনের সঙ্গে তাদের আত্মপরিচয়ের নানা ধরনের দ্বন্দ্ব বিদ্যমান ছিলই।
তার পরেও ১৯৭৫ সালে চিয়াং কাই-শেকের মৃত্যুর পর তার পুত্র চিয়াং চিং-কুও সংযুক্ত চীনা প্রজাতন্ত্রের একটি সতর্কতামূলক তাইওয়ানাইজেশন নীতি গ্রহণ করলে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক শাসনে আপেক্ষিক উদারীকরণের সূচনা ঘটে। উল্লেখ্য, চীন-তাইওয়ান দ্ব›দ্ব এখনো বিদ্যমান। এই দ্ব›দ্ব কখনো সদর্থক, কখনো নঞর্থক। কেননা, সেখানে কোনো কোনো দল এবং জনগণের একটি অংশ তাইওয়ানকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে দেখতে চায়। কেউ কেউ চীনের সঙ্গে একীভ‚ত হওয়ার পক্ষে আর জনগণের একটা বিরাট অংশ এখনো মনস্থির করে উঠতে পারেনি। তারা বরং তাইওয়ান এখন যে অবস্থায় আছে, সে অবস্থাতেই থেকে যাওয়ার পক্ষে। অর্থাৎ চীনেরও অংশ নয়, আবার চীন থেকে আলাদাও নয়।
তাইওয়ানের বড় দুই দলের মধ্যে ‘ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি’ এখনো অবশ্য স্বাধীনতার পক্ষে। অন্যদিকে কুওমিনটাং পার্টি (কেএমটি) চায় মূল চীনের সঙ্গে একত্রীকরণ। এমন আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাইওয়ানের সমাজে কবিতার কাজ ছিল নতুন বিকল্পের একটি পরিসীমা নির্ধারণ করা। কবিরা এখনো সে চেষ্টাতেই সচেষ্ট। এই কবিদের মধ্য উল্লেখযোগ্য কবি : লিন লু (১৯), চি-চু ইয়াং (১৯৮১), চেন হুউশি-চেন (১৯), মিয়াও-ই তু (১৯৬১), মিং-কেহ্ চেন ( ১৯৫৬), কোবলি চ্যাং (১৯), লি কুয়েই-শিয়েন ( ১৯৩৭), চ্যাং-হিসিয়েন লি (১৯৫৪), হসি পি-হসিউ (১৯), লি ইউ-ফ্যাং (১৯৫২) প্রমুখ।
তাইওয়ানের হাক্কা জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। তাঁদের লোকসংখ্যা ৪.৫ মিলিয়ন। এই জাতিগোষ্ঠী তাদের হাক্কা ভাষায় হাক্কা কবিতা রচনা করে থাকে, যা তাইওয়ানের কাব্য-সাহিত্যের অংশ। যারা আধুনিক তাইওয়ানের অংশ হিসেবে কবিতার যাবতীয় আধুনিকতার জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়েও হাক্কা ভাষায় লিখছেন। তাঁদের রচনায় হাক্কা সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাক্কা কবি: ফাংগে দুপান ( ১৯২৭-২০১৬), ফ্যাং-জু চ্যাং (১৯৬৪), সেং কুই-হাই (১৯৪৬), চিং-ফা উ ( ১৯৫৪) প্রমুখ।
ইতিমধ্যে, তাইওয়ান দ্বীপটি অর্থনৈতিক ও নগর উন্নয়নের একটি ত্বরান্বিত প্রক্রিয়ার মডেলে পরিণত হয়েছে; যা দেশটিকে গ্রামীণ অবস্থা থেকে একটি শিল্পসমাজে পরিণত করেছে। এই প্রক্ষাপটে উত্তর-আধুনিকতাবাদ এবং চীনা বনাম তাইওয়ানের চেতনাকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান উচ্চারিত মতাদর্শগত বিভাজনের মধ্যেও তাইওয়ানে আধুনিক কবিতা একটি টেকসই ভিত্তি অর্জন করেছে।
-মাসুদুল হক

Reviews
There are no reviews yet.