| | ০ মন্তব্য

পাঠ প্রতিক্রিয়া: সুলতানার স্বপ্ন ও আমার ভাবনা

আল আমিন ইসলাম

১৯০৫ সালে ইংরেজিতে প্রকাশিত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, সংক্ষেপে বেগম রোকেয়ার ‘সুলতানা’স ড্রিম’১ রচনাটি পুরো ভারতবর্ষে, বিশেষ করে বাংলায় নারীবাদী আন্দোলনের পথিকৃত, এবং একটি বৈপ্লবিক কল্পকাহিনী বলে বিখ্যাত হয়ে আছে। পরবর্তীতে ১৯২২ সালে (রোকেয়া-রচনাবলী, পৃষ্ঠা ১০২)২ বেগম রোকেয়া নিজেই কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে উপন্যাসটি ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নামে সর্বপ্রথম বাংলায় অনুবাদ করেন।
ইউনেস্কোর মেমোরি অব দা ওয়ার্ল্ড এশিয়া প্যাসিফিক কমিটি মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটারে ৬-১০ মে, ২০২৪ অনুষ্ঠিত দশম বার্ষিক সভায় রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের সুলতানাজ ড্রিম কে বিশ্বস্মৃতির আঞ্চলিক রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করেছে।মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর রোকেয়ার প্রামাণ্য রচনা ও দলিলাদির সংরক্ষক হিসেবে বিধিবদ্ধভাবে এই প্রস্তাবনা পেশ করেছিলো এবং এর স্বীকৃতি আমাদের সবার জন্য হয়েছে আনন্দবহ।
আজ থেকে প্রায় সোয়াশ’ বছর পূর্বে বিশ্বের কোনো সমাজেই নারীদের ভোটাধিকার বলে কিছু ছিল না। আজকের সংজ্ঞায় নারী-অধিকার বলে কোনো কিছু ছিল না। কোথাও ছিল না সরকারী বা বেসরকারী সংস্থায় চাকুরির অধিকার, এমন কি ক্ষেত্রবিশেষে আদালতে সাক্ষ্য দেবার অধিকার থাকলেও প্রায় ক্ষেত্রেই তা ছিল উপেক্ষিত।
কিন্তু বিশ্বময় পুরুষ-শাসিত সমাজের সেই কঠিন বেড়াজালের আবদ্ধে বাস করেও ‘সুলতানার স্বপ্ন’-এ বেগম রোকেয়া পরুষজাতকে অকর্মণ্য, মোটাবুদ্ধি, যুদ্ধবাজ, এবং নারী-নিগৃহক আখ্যা দিতে কোনো পিছপা হননি।
প্রথমতঃ উপন্যাসটি ছিল কাল্পনিক। কল্পনাটি বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক দুই ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল এবং আছে। দ্বিতীয়তঃ এটি ছিল সমসাময়িক অন্ততঃ চারটি প্রধান প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্যের ওপরে ভিত্তি করে রচিত। তৃতীয়তঃ বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক দুটি ক্ষেত্রেই বেগম রোজকেয়ার কল্পনাটি ছিল ভবিষ্যতমুখী। সবচেয়ে বড় কথা হলো ভবিষ্যতের বিজ্ঞান নিয়ে তাঁর কল্পনাটি ছিল যৌক্তিক বা বাস্তবসম্মত; মস্তিষ্কের লাগামহীন চিন্তা-প্রসূত নয়। ফলে আজ থেকে সোয়া’শ বছর পূর্বে ভবিষ্যতের যে যে অভূতপূর্ব ও অশ্রুতপূর্ব বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি অগ্রগতির কথা তিনি লিখে গেছেন, বিগত চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর থেকে এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ আমরা পেয়ে চলেছি আজও।তিনি কীভাবে তখনকার উন্নততর বিজ্ঞানের সন্ধান পেয়েছিলেন তা ভাবলে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। এ নিয়ে গবেষণার অভাব রয়েছে।
গল্পের প্রধান বৈজ্ঞানিক উপকরণগুলো হচ্ছে সূর্যের আলো ও তাপ, আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ, বিমানে আকাশ-ভ্রমণ, এবং বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির প্রসার ঘটান। এই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও আবিষ্কারগুলোকে ভিত্তি করে মহিলা কল্পবিজ্ঞানীরা পুরুষকে গৃহবন্দি করার মত সামাজিক-প্রযুক্তি (সোশ্যাল-ইঞ্জিনিয়ারিং) ছাড়াও বৈদ্যুতিক-প্রযুক্তি, উড়োজাহাজ-প্রযুক্তি, আবহাওয়া-প্রযুক্তি, যুদ্ধ-প্রযুক্তি, গৃহস্থালী-প্রযুক্তি এবং কৃষি-প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি সাধন করেন। এর বাইরে আরো রয়েছে: ছোঁয়াচে রোগ প্রতিরোধ করে মহামারী নিয়ন্ত্রণ, যদিও এর বৈজ্ঞানিক কোনো উপাদান বইটিতে নেই। তিনি যেসব বৈজ্ঞানিক উপাদান ব্যবহার করেছেন সেগুলোর প্রায় সবই ছিপল প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি তত্ত্ব ও তথ্যের ওপর নির্মিত।
বিজ্ঞানের যে সব তথ্যকে তিনি উপন্যাসটিতে কাজে লাগিয়েছেন অথচ এর অধিকাংশই তিনি যে স্বচক্ষে সেসব অবলোকন করেন নি, তাঁর সময়ে বিরাজমান বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অবস্থা বিবেচনা করে অনেকটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। প্রাতিষ্ঠানিক বিজ্ঞানের ছাত্রী না হয়েও তিনি বিজ্ঞানের ভবিষ্যতমুখী যে সব উৎকর্ষের কথা বলেছেন, তাঁর সময়ের বিচারে তা শুধু ক্ষণজন্মা, চিন্তাশীল দার্শনিক এবং অত্যন্ত মেধাবী কোনো ব্যক্তির ভাবনায়ই উদ্রেক হওয়া সম্ভব।
সবচেয়ে লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে তিনি বিজ্ঞানের যে যে উৎকর্ষের কথা বলেছেন তার প্রায় সবকটির প্রমাণই হাতেনাতে আমরা পেয়েছি এবং পেয়ে চলেছি বইটি প্রকাশের কয়েক দশক পর থেকে।
বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি, বিমান ভ্রমন, সৌররশ্মি ও সৌরতাপ, বৃষ্টি ও আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণের কথা চিন্তা করেছেন। এতোদিন আগে এই বিজ্ঞানসম্মত ধারণা আসলেই বহুল সমাদৃত।
সবশেষে বলবো, নারীর অধিকার বা নারীবাদ নিয়ে যাঁরা পড়ালেখা করেন কিংবা কাজ করেন, তাঁদের জন্য রোকেয়ার লেখা ‘সুলতানা’স ড্রিম’ বা ‘ সুলতানার স্বপ্ন’ একটা অবশ্য পাঠ্য গ্রন্থ। এটাই বাংলা সাহিত্যের প্রথম পরিপূর্ণ নারীবাদী উপন্যাস। শুধু প্রথম বললেও ভুল হবে, এখন পর্যন্ত এটাই অন্যতম সেরা একটা কাজ। এর আগে যে নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলা হয়নি, তা নয়। তবে, এমন পরিপূর্ণভাবে, এমন প্রবলতা নিয়ে আর এমন প্রচণ্ড অভিনবত্বে আগে কেউ বলেননি।
নারীর অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে সুলতানার স্বপ্ন এক অভিনব প্রচেষ্টা। তাঁর সময়ে সমাজটাকে যেভাবে পুরুষরা নিয়ন্ত্রণ করেছে, নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ নিয়ে নারীদের অন্তঃপুরে বন্দী করেছে, অবগুণ্ঠিত করেছে, সেটাকেই একেবারে উল্টো করে দিয়ে নতুন এক সমাজের কল্পনা করেছিলেন বেগম রোকেয়া। এই অঞ্চলে তাঁর মতো করে এভাবে কেউ ভাবেনি।
রোকেয়া” বইতে লিখেছেন, “সুলতানা’স ড্রিমে যে নারীস্থান এবং নারীর আধিপত্যের কল্পনা, তা অভিনব অথবা মৌলিক নয়। এরিস্টোফেনিসের লাইসিসট্রাটা এর সর্বপ্রথম নিদর্শন, খৃস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে। উপন্যাসে এভাবের প্রতিফলন ঊনবিংশ শতাব্দীর সাহিত্যে একেবারে অনুপস্থিত নয়। তৎসত্ত্বেও বলা যায়, সুলতানা’স ড্রিম নামে স্বপ্ন, উচ্চতর কোনো দাবি বা ভানও নেই লেখিকার, তবু তাঁর স্বপ্ন একেবারে আজগুবি নয়। বরং তাঁর মধ্যেও ভবিষ্যতের ইঙ্গিত প্রতিবিম্বিত। ইতিমধ্যে মহিলাদের সামাজিক এবং পারিবারিক ভূমিকায় যে বিবর্তন এসেছে, তা থেকে এই মন্তব্যই সমীচীন।”

আল আমিন ইসলাম
লেখক, শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, স্নাতকোত্তর, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

Views: 0

বিভাগ: গ্রন্থালোচনা, বুক রিভিউ

লেখক সম্পর্কে

ISBN: