| | ০ মন্তব্য

মুমতাহহিনা খাতুন

বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে এই জেনারেশন-জেড।এখনকার সময়টা যেন এই প্রজন্মের হাত ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।বিশ্বের এই ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি,তথ্য প্রযুক্তির এই রাতারাতি সাফল্যের চূড়াই পৌছে যাওয়া,নতুন নতুন ভাবনা চিন্তার আবিষ্কার,বিস্ময়কর সব পরিবর্তন আর অপার সম্ভাবনার নেতৃত্ব সব কিছুর পিছনে এই জেনারেশন-জেডের এক অবিশ্বাস নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।এর একটা সবচেয়ে বড় এবং একটা বাস্তব উদাহারন হল বাংলাদেশের সদ্য দ্বিতীয় বিজয় লাভ।যার পেছনে রয়েছে এই প্রজন্মের শতভাগ ভূমিকা।আর এই প্রজন্মের হাত ধরে এই বিজয় শুধু বাংলাদেশকে মুক্ত করেনি সারা পৃথিবীতে একটা ঝটিকা বিপ্লবের বাণী ছড়িয়ে দিয়েছে। জেনারেশন-জেডের হাত ধরে লাভ করা বাংলাদেশের এই সাফল্যকে বিশ্বের অনেক দেশীই এখন রোল মডেল হিসেবে দেখছে।মধ্যে প্রাচ্যের দেশ ইরানের এর একটা বড় প্রভাব রয়েছে।আমি এই পর্বে ইরানের জেড প্রজন্মের তরুণীদের নিয়ে কথা বলব।
আমি শুরুতেই উল্লেখ করেছি যে বর্তমান সময়টা হচ্ছে জেনারেশন-জেডের সময়।ইরানে মোট জনসংখ্যার মধ্যে একটা বড় অংশ হচ্ছে এই প্রজন্ম। MEI এর তথ্য অনুযায়ী ইরানের ৮৩ মিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্যে ৭ ভাগ হচ্ছে এই জেনারেশন-জেড আর এর মধ্যে ৪ ভাগ তরুণী আর ৩ ভাগ তরুণ।এই হিসেবে ইরানে মোট জেড প্রজন্মের তরুণীর সংখ্যা প্রায় ৮৩০০০০০০ জন।
ইরানের যেহেতু একটা ইসলামিক রাষ্ট্র তাই ইরানের আর্থ  সামাজিক ও পারিবারিক প্রথাগুলো ও নিয়মকানুন গুলোও ধর্মীও এবং নিজেদের সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। শত শত বছর ধরে চলে আসা এই প্রবাহমান ধারা ইরানের উপর একটা আলাদা প্রভাব বিস্তার করে আসছে।কিন্তু এই একুশ শতকে এসে বিশ্বের এই আকস্মিক পরিবর্তন যেন পৃথিবীর বুকে এক নতুন পৃথিবীর জন্ম দিয়েছে।হাজারো বাধ্যবাধকতা,বহির্বিশ্বের একের পর এক নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে ইরানেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে এবং এক আমূল পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে।যদিও ইরান সরকার এই আমূল পরিবর্তনকে অস্বীকার করে পশ্চিমাদের চাল বলে অভিহিত করেছে কিন্তু ইরানের সাধারন জনগণ কখনই এর তোয়াক্কা করেই এই পরিবর্তনকে সাদরে গ্রহন করে নিয়েছে।যেহেতু ইরান সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী এই পরিবর্তন পশ্চিমা বিশ্বের আর তাই ইরান সরকার নারীদের এগিয়ে যাওয়াটাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনা। ধর্মকে পুঁজি বানিয়ে রাজনৈতিকভাবে নারীদের পোশাক-পরিচ্ছেদ্দ বিশেষ করে হিজাব কে মূলধন বানিয়ে এই তরুনী জেনারেশন-জেডকে পিছনের দিকে ফিরিয়ে আনার জন্য কোন রকমের চেষ্টার ত্রুটি রাখেনা এই সরকার।কিন্তু ইরানী এই সাহসি তরুনী জেড প্রজন্ম এর প্রতি কোন ভুরুক্ষেপ না করেই নিজেদেকে একটা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন উপহার দেয়ার চেষ্টা করে আসছে সরকার এবং দেশের আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে।
একটা মানুষের আচার-আচরণ রীতিনীতি মানবিক মূল্যবোধ যেমন পরিবার থেকে শিক্ষা লাভ করে ঠিক তেমনি দেশের অভ্যন্তরীণ আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার উপর এই আচার-আচরণ রীতিনীতি মানবিক মূল্যবোধ অনেকটায় নির্ভরশীল।ইরানেও ঠিক তেমনটায় দেখা যায়।ইরানের যখন এই জেনারেশন-জেড জন্মগ্রহণ করে ও বেড়ে উঠে তখন ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট এক রকম ছিল আর এখন এক রকম যা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই রাতারাতি বদলে যাওয়া এই আকস্মিক পরিবর্তনের একটা বড় প্রভাব এসে পড়ে এই প্রজন্মের উপর।এরা না পারে অতীতকে ঝেড়ে ফেলতে না পারে এই নতুনত্বকে সম্পূর্ণভাবে গ্রহন করতে। আসলে এইটা একটা জেনারেশন-জেড এর বড় বৈশিষ্ট্য।
ইরানের তরুণী জেড প্রজন্ম অধিকাংশই কঠোর পরিশ্রমী।তারা সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত নিজেদেরকে ব্যস্ত রাখে তাদের রয়েছে নিজেদের দৈনিক রুটিন তারা তা মেনেই জীবনযাপন করে।ইরানের শতকরা ৮০ভাগ তরুণীরায় ব্যচেলর লেভেল থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করে।এদের অনেকেই দেখা যায় যে এক সাথে দুই তিনটা কাজের সাথে যুক্ত।১৮ বছরের পর থেকেই এরা বাবা মায়ের কাছে থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য নেয়া ছেড়ে দিয়ে নিজেরদের খরচ নিজেরায় বহন করে।ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা যেহেতু শোচনীয় এবং জীবন যাত্রার মান ব্যয়বহুল তাই একটা স্বাভাবিক জীবন পার করার জন্য এদের অনেক বেশী ঘাম ঝরানো লাগে।তাদের মেধা দক্ষতা ও শৈল্পিকগুনও অনেক বেশী।এরা অতি কম সময়ের মধ্যে অনেক কিছু আয়ত্ত করে ফেলতে পারে অতি দক্ষতার সাথে। বিশ্ববিদ্যালয়,হসপিটাল,রেস্টুরেন্ট, ফার্মেসী,আইটি ফার্ম,ব্যাংক সহ ইরানের বড় বড় সকল কোম্পানিতে সমান ভাবে অতি দক্ষতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে এই তরুণীরা।ইরানের রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে অফিস আদালত সব পেশাতেই জেনারেশন-জেড এর দেখা মিলে। আর তাদের সাহস আর সাহসিকতার প্রশংসা করতে হয় বটে।
আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে ইরানের পরিবারগুলো মূলত ধর্মীয় আর প্রথাগত ভাবে গড়ে উঠেছে, এমন অনেক কম পরিবারের দেখা মিলে যারা এই রকম প্রাচীন ভাবধারা থেকে বের হয়ে এসে স্বাভাবিক নতুনত্বকে গ্রহন করে নিয়েছে। আর স্বাভাবিকভাবেই একজন তরুণীর পক্ষে এই রকম পরিবারের বেড়াজাল ছিন্ন করে নিজেদের মত একটা স্বাভাবিক নতুন জীবন গড়ে তুলতে অনেক ধৈর্য্য রেখে লড়াই করে যেতে হয়।আমি নিজেও দেখেছি এই ক্ষেত্রে তারা অনেক বড় ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়ে থাকে।এরা কারো উপর সহজে রেগে যায়না,উচ্চস্বরে কথা বলেনা,সব সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করে।এই প্রজন্ম অসীম ধৈর্য্য নিয়ে সব সময় সবকিছু মোকাবেলা করতে প্রস্তুত।
অন্যদিকে সাহসিকতা নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই যেই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে হয় তা হল ২০২২ সালের হিজাবকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া সেই বিপ্লব।এই বিপ্লবে অংশগ্রহন করা ৮০ ভাগই ছিল এই তরুনী জেনারেশন-জেড।তারা সকলে পরিবারের মায়া ত্যাগ করে সকল কিছুর অবাধ্য হয়ে যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে তা সত্যই স্মরণ করে রাখার মত। ইরানের আইনুযায়ি কোন নারী কোন পুরুষের সামনে মাথায় কাপড় ছাড়া বের হতে পারবেনা।কিন্তু বিপ্লবের সময়টাতে এই প্রজন্ম জনসম্মুখে এসে বিশেষ করে  বিশ্ববিদ্যালয়,রাস্তায় পুলিশের সামনে খোলামেলা অবস্থায় যেভাবে আন্দোলন করেছে তা সত্যিই ইরানের জেনারেশন-জেড এর জন্য অতি গর্বের বিষয়।আর এই সাহসিকতার কারনে বিপ্লব শতভাগ সফল না হলেও এখন আগের চেয়ে অনেকটায় নারীরা খোলামেলা স্বাধীনভাবে জনসন্মুখে চলাচল করতে পারে।আর ইরানী জেনারেশন-জেড এর একটা অর্জন বটে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো ইরান যদিও পৃথিবীর বুকে নিজেদেরকে ইসলামিক রাষ্ট্র বলে দাবী করে আসছে কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা হলো ইরানের এই জেনারেশনের প্রায় ৯০ ভাগ কোন ধর্মেই বিশ্বাস করেনা।তারা শুধু আল্লাহর অস্তিত্বকে বিশ্বাস করে।তারা মনে করে যে যেহেতু একজন নাগরিক হিসেবে এমরা আমাদের নিজেদের ধর্ম, আকিদা নিজেরা নির্বাচন করতে পারিনা,আমাদের নির্বাচন করার কোন অধিকার নেই তাই আমরা কারো নির্বাচন করে দেয়া ধর্মে বিশ্বাস করতে রাজী নয়।আমরা শুধু বিশ্বাস করি যে আল্লাহ আছেন।তারা কোন রকমের ধর্মীয় উৎসবে কোন আলোচনা-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেনা।ধর্ম সম্পর্কিত যে কোন বিষয়ে নিজেদেরকে সম্পূর্ণরুপে বিরত রাখে।আসলে ধর্ম তাদের কাছে এক উপহাসের বিষয় ছাড়া কিছুই না।
ইরানের অভ্যন্তরীণ অবস্থা যেহেতু দিনে দিনে শোচনীয় হয়ে আসছে।যুদ্ধ,নিষেধাজ্ঞা,অর্থনৈতিক মন্দা,নারীদের হিজাবের বাধ্যবাধকতা সব মিলিয়ে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে, এই অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলো ইরানী নাগরিকদের দৈনন্দিন দুশ্চিন্তার কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে।বিশেষ করে এই জেনারেশ জেডের জন্য।আর তারা তাদের ভবিষ্যৎ এবং আগামী প্রজন্ম নিয়ে অনেকটায় হতাশ এবং অনিশ্চয়তায় ভুগছে।যদিও এই সকল সমস্যার মধ্যে তারা নিজেদেরকে সার্বিকভাবে সবদিক থেকে ভালো রাখার চেষ্টা করে আসছে।কিন্তু তারপরেও বেশীরভাগই মনে করে যে ইরানের মাটিতে তাদের জন্য কোন ভবিষ্যৎ নেই।কোন প্রকারের ব্যাক্তিগত ,অর্থনৈতিক ও সামাজিক,ধর্মীয় এমনকি মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। আর এই জন্যেই তাদের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হল ইরান ত্যাগ করা।তারা নিজেরদের মাতৃভূমিকে বর্তমানে বসবাসের অযোগ্য বয়লে মনে করে ।জেনারেশ জেডের ভাষ্যনুযায়ী তারা এই খানে প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নিতে পারেনা,প্রতিটা মুহূর্তে শুধু অস্বাভাবিক দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতা কাজ করে যা এক রকমের তাদেরকে মানসিক রোগি বানিয়ে ফেলেছে।এইজন্য তারা যে কোন মুল্যে ইরান ছেড়ে স্বাধীনভাবে বাঁচার জন্য অন্য কোন দেশে স্থায়ী হতে চায়।আসলেই এই মুহূর্তে ভবিষ্যৎবাণী করা কঠিন যে তরুনী জেনারেশ জেডের এই দূরদর্শী সিধান্ত কই সত্যিই কি ইরানের মত দেশের জন্য কল্যাণকর নাকি হুমকিস্বরূপ।
আমি আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে পারস্যের এই তরুনী জেনারেশ জেড বাস্তবিক অর্থে পারস্যের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ।তাদের জ্ঞান-গরিমা,পরিশ্রম,দায়িত্বশীলতা,বুদ্ধি,সাহস সত্যই অনেক প্রশংসার দাবীদার যদি সেতা ইরান সরকার সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে।

লেখক
মুমতাহহিনা খাতুন, শিক্ষার্থী, স্নাতকোত্তর (ভাষাবিজ্ঞান), আল-যাহরা বিশ্ববিদ্যালয়, তেহরান, ইরান

Views: 0

বিভাগ: প্রবন্ধ/নিবন্ধ

লেখক সম্পর্কে

ISBN: