বাউলতত্ত্বের উৎপত্তি, বিকাশ ও দার্শনিক ভিত্তি
ইফতেখার রবিন
বাউলতত্ত্ব বাংলাদেশে বিকশিত এবং চর্চিত বিশেষ ধর্ম দর্শনের নাম। বহু ধর্মদর্শনের সংমিশ্রণে এ তত্ত্ব গড়ে উঠেছে, বঙ্গদেশের বাউলরাই এ দর্শনকে সৃষ্টি করেছে। তাই এ তত্ত্ব একান্তই বাঙালির। বাউল সাধকরা কোনো অলৌকিক গল্পকথা দ্বারা নিজেদের দর্শনকে মহিমান্বিত করার চেষ্টাও করেননি। বাউল সাধকদের ভাবনা প্রচারের পরিবর্তে সংক্রামিত হয়েছে শিষ্যদের কাছে, শিষ্যদের মাধ্যমে। সেকথাও আবার সবার জন্য হয়ে ওঠেনি। বাউল গানের কথা যত সহজ, ভাবের বিচারে তার চেয়েও কঠিন। বাউল গানের রহস্যভেদ করতে হলে বাউলতত্ত্বের উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে ধারণা থাকা আবশ্যক।
ভারতের আদিম জনগোষ্ঠীসমূহের ভিতর অনার্য প্রোটো-অস্ট্রালয়েডদের দ্বারা আদিম কৃষির উদ্ভব ঘটেছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার সূত্রে যেসব নমুনা এ অঞ্চলের হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো থেকে পাওয়া গেছে, তার ভিত্তিতে এদের সভ্যতাকে সামগ্রিকভাবে সিন্ধু সভ্যতা নামে অভিহিত করা হয়। এরা প্রোটো-অস্ট্রালয়েডদের কৃষিকে গ্রহণ করেছিল। ধর্মীয় তত্ত্বের বিচারে এ সমাজেও মৈথুনতত্ত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। আদি শৈব তান্ত্রিক ভাবনা ও সাংখ্যদর্শন শাক্ত ধর্মের নারীকে আদ্যাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সাংখ্যদর্শনের প্রকৃতি আর নারী সমার্থক হয়ে যায়। অন্যদিকে, শক্তিমান শিব হলো পুরুষসত্তা। এ মতে নারীশক্তিতেই পুরুষ হয়ে ওঠে শক্তিমান। মৈথুনতত্ত্বের নারীসত্তার সাথে পুরুষসত্তার মৈথুনে সৃষ্টি হয় নতুন সত্তা। আদি শৈবতান্ত্রিক শাক্ত ধর্মের যোনি প্রতিমা পদ্ম হয়েছে পূজার উপাদান। এ পূজায় যুক্ত হয়েছে বীজমন্ত্র, যোগক্রিয়া, মুদ্রা ইত্যাদি। এসব সাধনার অঙ্গ নিয়ে তৈরি হয়েছে সাধনার গুহ্য পদ্ধতি।
শাক্ত তান্ত্রিক মতে, মেরুদণ্ডকে আশ্রয় করে ছয়টি, চক্র রয়েছে। এ ছয়টি চক্র হলো মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুরি, অনাহত, বিশুদ্ধ ও আজ্ঞা চক্র। এর সন্নিহিত পদ্ম (যোনি) এবং ইড়া, পিঙ্গলা এবং সুষুম্না নারীর প্রতীক। এ ষটচক্রের নিচে রয়েছে চক্রাধার চক্র। এতে সৃষ্টিরূপা কুণ্ডলিনী ঘুমিয়ে আছে। আর ওপরে রয়েছে শিব। যৌগক্রিয়া সৃষ্টিরূপা কুণ্ডলিনীকে জাগিয়ে পরবে শিবের সাথে মিলন ঘটাতে পারলে ত্রিগুণাতীত শিবের উপলব্ধি অনুভব করা যায়। তাই এ সাধনায় নারীর প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বেশ্যা, নটী, রজকী ও ব্রাহ্মণীকে প্রকৃত যোগ্য সাধন সঙ্গী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
শাক্ততন্ত্রও বৌদ্ধতন্ত্র মিলে সৃষ্টি হয়েছিল যোগতন্ত্রভিত্তিক বৌদ্ধ মহাযান মত খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের দিকে ক্ষান্তি পারমিতা, দান পারমিতা নামক দেবীর উৎপত্তি ঘটে। এ সময় বীজমন্ত্রেরও উদ্ভব হয়। মন্ত্রনির্ভর এ পূজা ও ধ্যান পরবর্তী সময়ে মন্ত্রযান পদ্ধতির সৃষ্টি করে। ধর্মীয় আচরণে ধীরে ধীরে নানা মতের সৃষ্টি হতে থাকে। পালবংশীয় রাজত্বকাল বৗদ্ধধর্ম তিনটি মতে বিভক্ত হয়ে যায়। এ ভাগ তিনটি হলো বজ্রযান, কালচক্রযান এবং সহজযান।
সহজিয়া মর্তে, মানুষের ভিতরেই রয়েছে পরমাত্মা ও জীবাত্মা। জীবাত্মার অসততা, লোভ লালসা, ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদির বিসর্জন দিলেই পরমাত্মার সাথে মিলিত হওয়া সম্ভব। এর জন্য ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, অন্ত্রমন্ত্রের জটিলতার প্রয়োজন নেই। সহজিয়া এ ভাবনার সূত্রে, এসময়ে ভিতরে আবির্ভাব ঘটেছিল বহু সিদ্ধা বা ধর্মগুরুর। এদের অধিকাংশই বাংলা, মিথিলা, উড়িষ্যা ও কামরূপের অধিবাসী ছিলেন। এ কারণে এসব অঞ্চলে সহজিয়া সাধনতত্ত্ব প্রাধান্য পেয়েছিল। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের শেষভাগে সহজিয়া বৌদ্ধ দর্শনের সাথে শৈবধর্মের সমন্বয় হয়ে তৈরি হয়েছিল নাথধর্ম। ফলে আদি সহজিয়া এবং মিশ্র নাথ মতাদর্শের গুরু সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছিল অনেক। তবে উল্লেখযোগ্য ৮৪ জন সাধককে সিদ্ধাচার্য হিসেবে মান্য করা হয়। এদের সাধনমার্গের অবলম্বন ছিল তন্ত্র, হঠযোগ, সহজিয়া ও শৈবাচারের মিশ্র দর্শন। এদের অনেকের দ্বারা রচিত হয়েছিল বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের আদি নমুনা চর্যাপদ। সহজিয়া বৌদ্ধ মতাদর্শ এবং শৈব তান্ত্রিক ভাবনার সংমিশ্রণে বাউল ধর্মের বিকাশ ঘটেছিল। গোড়ার দিকে এ ধর্মে ছিল পরমাত্মা ও জীবাত্মার বিশ্বাস। ধ্যানের ভিতর দিয়ে পরমাত্মার সাথে মিলিত হওয়ার যোগাচারের সাথে যুক্ত হয়েছিল বামাচারী সাধনা।
১২০০ খ্রিস্টাব্দের পরে বঙ্গদেশে মুসলমান সুফি সাধকদের সংস্পর্শে আসে বাউলরা। এসব সুফিবাদীদের মাধ্যমে বাংলাদেশে সুফিবাদ বাংলার বাউলদের প্রভাবিত করেছিল। ‘বাউল’ শব্দটির উন্মত্ত বা পাগল অর্থে মধ্যযোগের কাব্যে ব্যবহার লক্ষ করা যায়।জানা যায়, সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের রাজত্বকালে মুহম্মদ সগীর ‘ইউসুফ জোলেখা’ কাব্য রচনা করেন। এ কাব্যে তিনি প্রথম বাউর, বাউল, আউল শব্দ ব্যবহার করেন। যেমন-
“বিরহে তাপিত কম্পিত হৃদয়, উরত লোরএ কেশ।
এলিন বয়ান কাতর নয়ান আইল বাউল বেশ।”
শাহ মুহম্মদ সগীরের সময় বাউলদেরকে (বাউর) অস্বাভাবিক,
জাতকুলহীন নীচস্তরের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সমাজের চোখে হীন এবং স্বভাবে উন্মাদ এমন ব্যক্তিকে বাউল নামে অভিহিত করা হতো। আরও পরে মালাধর বসু তার শ্রীকৃষ্ণবিজয় কাব্যে (রচনাকাল ১৪৭৩ থেকে ১৪৮০) খ্রিষ্টাব্দ। ‘বাউল’ শব্দটি উশৃংখল , উন্মত্ত বা পাগল অর্থে ব্যবহার করেছেন, উপমা হিসেবে। সপ্তদর্শ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলা ভাষায় ‘বাউল’ শব্দের দ্বারা বুঝানো হয়েছে বাহ্যজ্ঞানহীন, উন্মাদ, স্বাভাবিক চেতনাশূন্য, খ্যাপা ইত্যাদি অর্থে। এ নামগুলো দিয়েছিলেন যারা বাউল ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখিয়েছেন, যারা প্রথাগত ধর্মমতের বাইরে এসে ভিন্নমতকে গ্রহণ করতে পারেননি। এরূপ ধারণার পিছনে বাউলদের জীবনযাত্রার ধরনও কম দায়ী নয়। অন্তত কয়েকটি কারণে বৈষয়িক মানুষ এবং মোল্লাপুরতরা বাউলদেরকে ভিন্ন জাতের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতেন।
বাউল দর্শনে সুফি, বৈষ্ণব মতের প্রভাব থাকলেও, এ ধর্মমত গড়ে উঠেছে স্থানীয় লোকাচার, স্থানীয় মানুষের সামাজিক এবং মানসিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে। এ কারণেই বাউলধর্ম কোনো একক ব্যাক্তির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মত নয়। যতদূর জানা যায়, খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাউল দর্শন গোপনীয় সাধন পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এ পর্যায়ে মাধববিবি নামক একজন মুসলমান রমণীর নাম পাওয়া যায়। এ মাধববিবির শিষ্য ছিলেন বীরভদ্র (১৪৭৩-১৫৪৪ খ্রিস্টাব্দ)। মূলত বীরভদ্রের মাধ্যমে বাউলদর্শন ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। এ কারণে অনেকে বীরভদ্রকে আদি বাউল বলে থাকেন। বীরভদ্রের মাধ্যমে গুরু শিষ্য পরম্পরা প্রতিষ্ঠাও পেয়েছে। মাধববিবির সমসাময়িক পরিমন্ডলে আউল চাঁদ নামক আরও একজন সাধকের নাম পাওয়া যায়।
অনেকে আউল চাঁদকে বাউল মতের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন মাধববিবি ও আউল চাঁদের আগের কোনো গুরুর নাম পাওয়া যায় না বলেই তারাই এ মতের আদি প্রবর্তক এটাও মানা যায় না। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে আউল চাঁদের সাথে রামশরণ পাল নামক অপর একজন সাধকের সখ্য গড়ে ওঠে। কথিত আছে আউল চাঁদ রামশরণ পালকে কর্তাবাবা অভিহিত করেছিলেন। আউল চাঁদের নেতৃত্বে রামশরণ এবং তার স্ত্রী সরস্বতী কর্তাভজা নামক বাউল মতবাদকে প্রতিষ্ঠা করেন। রামশরণের মৃত্যুর পর তার শিষ্যরা তার পুত্র দুলাল চাঁদের আনুগত্য প্রকাশ করেন এবং কর্তাভজা মতকে প্রচার করেন। দুলাল চাঁদ কর্তাভজা দল পরিচালনার পাশাপাশি গান রচনা করতেন। ১৩১৯ থেকে ১৩৮৪ বঙ্গাব্দের ভিতরে প্রকাশিত বিভিন্ন গ্রন্থে প্রায় ৬০০ গান পাওয়া যায়।
খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে বাংলার তৎকালীন সমাজব্যবস্থা এবং ধর্মের প্রভাবে এবং সমন্বয়ে বাউলতত্ত্বের বিকাশ ঘটেছিল পশ্চিম বঙ্গের নদীয়া এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলে। এ মতবাদের একটি প্রবল ধাক্কা লেগেছিল পদ্মার দুই পাড়ের কুষ্টিয়া ও পাবনা অঞ্চলে। সিরাজ সাই এবং লালন ফকিরের কল্যাণে বাউল গান একটি ভিন্নতর উৎকর্ষতায় পৌঁছেছিল। লালনের শিষ্যরা তাকে বয়ে চলেছেন আজও।
বাউলদের বস্তুবাদ মারফতের মাধ্যমে। আর মারফত জানতে হয় মুর্শিদের মাধ্যমে। মুর্শিদ হলো সেই শক্তির আঁধার, যিনি শিষ্যকে সরল-গরল, ভালো-মন্দের ভেদ-প্রভেদ বুঝিয়ে দেন। মুর্শিদ শিষ্যকে বাউলের গোপনীয় গুহ্যতত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা দেন। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, বাউল মতবাদ একটি মানস পুরাণ। দেহের আধারে যে চেতনা বিরাজ করছে, সে-ই আত্মা। এ আত্মার খোঁজ বা সন্ধানই হলো বাউল মতবাদের প্রধান লক্ষ্য। বাউলরা আল্লাহ, ঈশ্বর কিংবা সৃষ্টিকর্তাকে নিরাকার মানতে নারাজ। বাউলদের বিশ্বাস, ঈশ্বর নামক শক্তিকে তারা সাকার হিসেবেই মানেন তাই মানুষ ভজলেই ঈশ্বরের নৈকট্য সম্ভব। এ প্রসঙ্গে ড. আহমদ শরীফ তার বাউলতত্ত্ব গ্রন্থে লিখেছেন, “বিভিন্ন মতবাদের মিশ্রণে গড়ে উঠেছে বাউল মত।হিন্দু মুসলমানের মিলনে হয়েছে বাউল সম্পদায়। তাই পরমত সহিষ্ণুতা, অসাম্প্রদায়িকতা, গ্রহণশীলতা, বোধের বিচিত্রতা,মনের ব্যাপকতা ও উদার সদায়শতা এদের বৈশিষ্ট্য।” মানুষ নির্বিশেষকে এমন উদার দৃষ্টিতে দেখা যে জীবনবোধের দ্বারা সম্ভব, তার উৎস যে ধর্মমত মরমিবাদ তা কখনও তুচ্ছ হতে পারে না। মুসলমান বাউলদের হিন্দু গুরু বা হিন্দু বাউলদের মুসলমান গুরু এমন প্রায়ই দেখা যায়।
বাউল তত্ত্বের কয়েক ধাপ আদর্শ রয়েছে। যেমন- গুরুবাদ, শাস্ত্রহীন সাধনা, দেহতত্ত্ব, মনের মানুষ, রূপতত্ত্ব প্রভৃতি হলো বাউল তত্ত্বের আদর্শসমূহ। তন্মধ্যে গুরুবাদে গুরু শিক্ষক, পরামর্শদাতা, পথপ্রদর্শক, মুর্শিদ। তিনি মানব গুরু এবং পরম পুরুষ দুই-ই তাকে ঘিরেই গুরুতত্ত্ব। যেমন গুরু সম্পর্কে লালনের সহজসরল স্বীকারেত্তি।
“যেই মুর্শিদ সেই তো রাসুল, ইহাতে নাই কোন ভুল, খোদাও সেই হয়, লালন কয় না এমন কথা, কোরআনে কর।”
দেহতত্ত্বে বাউল সাধকদের সাধনা দেহের ওপর আশ্রয় করে গড়ে ওঠে। কারণ ঈশ্বর, দেবতা সবই কাল্পনিক, মানুষের বিশ্বাস। সাধারণ মানুষের জন্য এগুলো প্রতীক মাত্র। আসলে পরম পুরুষ বাস করেন শরীরে। তাই শরীরের সাধন শ্রেষ্ঠ সাধন।
মনের মানুষ হলো দেহস্থিত আত্মা। আত্মাই বহু নামের মানুষ ভবের মানুষ, রসিক মানুষ, সোনার মানুষ ইত্যাদি। লালন তাকে স্মরণ করেন:
“এই মানুষে আছেরে মন, যারে বলে মানুষ রতন। লালন বলে, পেয়ে সে ধন পারলাম নারে চিনিতে ॥”
রূপ-স্বরূপতত্ত্বে দেহ বা কান্তি চেতনাই সব। রূপ হলো নারী বা প্রকৃতি আর স্বরূপ হলো নর বা পুরুষ। রূপ এবং স্বরূপ এর দৈহিক মিলনেই সাধন সম্পূর্ণ হতে পারে। রূপ-স্বরূপ এর ভবের তাৎপর্য বুঝার জন্য হলেও তাদের মিলনের প্রয়োজন।
মূল বাউলতত্ত্বের কোনো জাত বিচার নেই। শ্রেণিহীন সহজসরল জীবনের অভিসারী বাউলরা একেশ্বরবাদী, ত্যাগের আদর্শবাদী। কিন্তু সেই একেশ্বরবাদী সত্তা মানেই আল্লাহ, ভগবান, ঈশ্বর কিংবা কোনো সৃষ্টিকর্তা হতেই হবে এমন কোনো বাধ্য নিয়ম নেই, অনেক বাউলই Mysticism বা অতীন্দ্রিয়বাদে বা অদৃশ্য সত্তায় বিশ্বাসী যাকে কোনো নির্দিষ্ট সৃষ্টিকর্তার আওতায় ফেলাকে এক অর্থে অসম্ভব ব্যাপার। কোনো কোনো বাউল সম্প্রদায়ের মতে, বাউল সাধনায় দেহ সাধনা প্রধান বলেই নরনারীর আঙ্গিক মিলন অপরিহার্য। এ হলো যুগল সাধনা। যুগল সাধনা দুই প্রকার-স্বকীয়া এবং পরকীয়া। তবে পরকীয়া বেশি প্রার্থিত। বাউলদের মতে, পঞ্চরস পান না করলে প্রকৃত সাধক হওয়া যায় না। যুগল সাধনার ক্ষেত্রে মুসলমান বাউল স্বকীয়া তথা স্ত্রীকেই সাধারণত সাধন-সঙ্গিনী করে। এক্ষেত্রে দম সাধনা- শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে তত্ত্ব ধারণ করাই হলো বাউলদের মূল তত্ত্ব।
বাউলতত্ত্ব বাংলার মাটি, মানুষের জীবনবোধ ও বহু ধারার মিলিত সংস্কৃতির একটি মৌলিক দর্শন। আদিম লোকাচার থেকে শৈব-তান্ত্রিক সাধনা, সহজিয়া ও নাথধর্মের গুঢ় তত্ত্ব, পরে সুফিবাদের মানবতাবাদী মরমিয়া ভাব—সবকিছুর সংশ্লেষে গড়ে ওঠা এই মতবাদ বাঙালির আত্মিক ঐতিহ্যের অনন্য সম্পদ। বাউল সাধকরা কোনো ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিকতার প্রতি অনুগত নন; তাঁদের বিশ্বাস মানুষের ভেতরেই লুকোনো পরম সত্যকে খুঁজে পাওয়া। তাই বাউলধর্মের কেন্দ্রবিন্দু হলো দেহতত্ত্ব, মনের মানুষের সন্ধান ও মানবগুরু বা মুর্শিদের দিশা। প্রথাগত ধর্মসংস্কারের বাইরে দাঁড়িয়েড বাউলরা মানুষে মানুষে মিলনের দর্শন প্রতিষ্ঠা করেছে—যেখানে জাত, কূল, ধর্ম, লিঙ্গ কোনো বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে না। এই উদার মরমিয়া জীবনবোধই বাউলতত্ত্বকে করেছে অসাম্প্রদায়িক, গ্রহণশীল ও মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
লালন ফকিরসহ অসংখ্য সাধকের ভাবধারা প্রমাণ করে, বাউলতত্ত্ব কেবল সংগীতের ঐতিহ্য নয়—এটি মানুষের আত্ম-অনুসন্ধানের এক চিরন্তন পথ। দেহ ও চেতনার মিলনে, রূপ-স্বরূপের সমন্বয়ে এবং মনের মানুষের আবিষ্কারে যে মুক্তির স্বাদ লাভ হয়, তা-ই বাউল সাধনার শেষ কথা। তাই বাউলতত্ত্বের মূল শিক্ষা—মানুষকে ভালোবেসে, নিজের ভিতরে সত্যকে আবিষ্কার করে, সমগ্র মানবজাতিকে একই বন্ধনে দেখার দৃষ্টিই আসল মুক্তির পথ। এই মানবিক দর্শন আজও বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনাকে সমৃদ্ধ করে চলেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।
লেখক: ইফতেখার রবিন, লেখক ও শিক্ষার্থী , বাংলা বিভাগ , ঢাকা কলেজ, ঢাকা
Views: 0