লেখক- পুরুষোত্তম সিংহ
বাংলা কাব্যের মোড় ঘুরিয়েছেন সন্তোষ সিংহ ‘রমণীমোহনের সঙ্গে আলাপ’ (২০২৫) কাব্যে। বাংলা কবিতার ক্রমাগত ম্যাড়মেড়ে একতরফা খুকু কাব্য বাজারে তিনি নতুন করে ছেড়ে দিয়েছেন এ কাব্য। বাংলা কবিতার জোরের জায়গা কোথায় তা তিনি আদ্যন্ত প্রমাণ করেছেন বিবিধ কাব্যে। আপাত দুরূহ, অতিরিক্ত শব্দ প্রাবল্য, উত্তর আধুনিক বয়ান নয় সহজিয়া সত্যে শব্দের গুপ্তধনকে সঠিকমাত্রায় সঠিক নির্বাচনে প্রয়োগ করে কবিতার তেজ কতখানি খতরনাক হতে পারে তা হাতে কলমে দেখিয়ে গিয়েছেন কয়েক দশক ধরে। দেশকাল সমাজ সংসারের সঙ্গে সংযোগ রেখে, জীবনের অমোঘ পাণ্ডুলিপি সংস্কার করে প্রথাগত নান্দনিকতার বেড়াজাল ডিঙিয়ে নতুন কাব্যসত্য কীভাবে নির্মাণ করা সম্ভব তার জবরদস্ত শিল্পী সন্তোষ সিংহ। ‘রমণীমোহনের সঙ্গে আলাপ’ তাঁর অব্যর্থ গাণ্ডিব। তিনি না রমণীমোহন কে জয়ী, আর কে পরাজিত, কে কার পথ প্রদর্শক, কে ভ্রষ্ট আত্মা আর কে রত্নাকর থেকে বাল্মীকি আমরা জানি না। জানতেও চাই না। জানতে চাইলে কাব্যস্বাদের ভাগ যে কম পড়ে।
রমণীমোহন প্রকৃতপক্ষে কবির সত্তার অংশ। দ্বিরালাপের কৌশলক্রিয়া। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বড় আমি, ছোটো আমি। চেতনায় তো আমি-তুমি’র খেলা চলে। ব্যক্তি কাউকে সামনে রেখে যুক্তি সাজায়, কথাক্রিয়া গড়ে তোলে। নাটকে সংলাপের জন্য দুইজনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু কবির মনোভূমিতে কেউ যেন স্বপ্নসন্ধানে হাজির হয়। রমণীমোহন কবির অস্তিত্বের অংশ। অস্তিত্বের সারথি, বন্ধু, পথ প্রদর্শক, নিয়ন্ত্রক। কবির কথাযাত্রা, কাব্যক্রিয়ার মানস সারথি। কবি রমণীমোহনকে সামনে রেখে বক্তব্য সাজান। নিজের ক্লেদ, বিষণ্ণতা, যন্ত্রণা, সার্বিক কল্যাণ-মঙ্গল-অমঙ্গল-সদর্থক-নঞর্থক-জীবন পিপাসা-কাম-আকাঙ্ক্ষা যেমন উদ্ভাসিত হয় তেমনি সমাজের পতন-অন্ধকার-ভীরুতা-নষ্টামি-ভণ্ডামি করুণ বাঁশিতে বাজে। কবি মানুষকে মুক্তির পথে, কল্যাণের পথে, হিতসাধনের পথে পৌঁছে দিতে চান। কিন্তু পথে নেমে দেখেন বিস্তর বাঁধা। কবি দ্বিধান্বিত, সংশয়ান্বিত, প্রশ্নাতুর, উদ্দেশ্যহীন। অনবরত রমণীমোহনকে প্রশ্ন করেন। কখনো যাত্রাসঙ্গী করে রমণীমোহনকে নিয়ে পথে নামেন। পথে তো বিস্তর অন্ধকার। আখেটিক জন্মের শেষেও তো পুণ্য আত্মার সন্ধান পাওয়া যায় না। কিন্তু কবি হিসেবে তিনি তো মানুষকে মুক্তির পথে, স্বাধীন চিন্তার পথে, আরোগ্যের পথে পৌঁছে দিতে দায়বদ্ধ। কবিকে বারবার জীবনভাবনা, পথচলায় বদল আনতে হয়। কবিতা তাত্ত্বিক ভাবনায় ভেসে যায়। শুধু তাত্ত্বিক পরিসরই নয় জীবন ভাবনায় বদল আনেন। যে কবি জানতেন পৌঁছে যাওয়াই একমাত্র সত্য সেই কবি জীবনের অনন্ত পথ চলায় ক্ষতবিক্ষত হতে হতে উপলব্ধি করেন—“চলাটাই আসল, পৌঁছে যাওয়া নয়”।
ব্যক্তি দ্বিধা থরথর চিত্তে চলমান। লোভ-আকাঙ্ক্ষা-খ্যাতি-মোহ নিয়ে অস্তিত্ব বারবার টাল খায়। ব্যক্তি তো নিজেকে আক্রমণ করতে পারে না। ‘সুবিমলের বিরুদ্ধে সুবিমল’ উচ্চারণ সবার দ্বারা অসম্ভব। চেতনা কিন্তু এক। তাই কবি সত্তার অপভ্রংশ রমণীমোহনকে প্রশ্ন করেন, আক্রমণ করেন। তীব্র দ্বিধা নিয়ে শানিত তরবারি হানেন। আসলে রমণীমোহনকে তিনি প্রহরাঘাতে ঠিক রাখতে চান। কোথাও ব্যঙ্গ বিদ্রুপে ভরে যায়। ভাষায় গুরুচণ্ডালী যুগপৎ ক্রিয়া চলে। কোথাও ভাষার ভদ্র বিন্যাস স্বেচ্ছাকৃতই ভেঙে দেন। দুর্বিষহ সময়, যন্ত্রণা, নৈরাজ্যবাদী চক্রান্তে ভাষার শুদ্ধতা বজায় থাকা অসম্ভব। সন্তোষ সিংহ শব্দকে প্রয়োগ করেছেন বাক্যের অন্তর্গঠনের উপর। যা কবিতাকে মাধুর্য, শ্রুতিমধুর কাব্যিক সৌকর্য দান করে।
সন্তোষ সিংহ অত্যন্ত ফর্ম সচেতন কবি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেমন ফর্ম বদল করেন তেমনি বক্তব্য রোমান্টিক, যুক্তিগ্রাহ্য, গাম্ভীর্যপূর্ণ করতে নব্য ফর্ম বেছে নেন। আবার কেবল ফর্মই শেষ সত্য নয়। ভাষা-বক্তব্য-নান্দনিকতা-কাব্যিক সত্য বজায় রাখতে ফর্মকে কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে সে বিষয়ে দক্ষতা প্রশংসারযোগ্য। বাংলা কাব্যের পালাবদলে উল্লেখযোগ্য সংযোজন ‘রমণীমোহনের সঙ্গে আলাপ’ (২০২৫) কাব্য। যদিও তিনি এই সিরিজ দীর্ঘদিন (১৯৮৫-২০২২) ধরে লিখেছেন। ‘রাত্রিভূমি’ (১৯৯৩) কাব্যে রয়েছে তিন থেকে পাঁচ সংখ্যা। ‘অতি মর্ত্যদেশ’ (২০০৫) কাব্যে রয়েছে এক থেকে এগারো সংখ্যা। ‘সদর দরোজা জুড়ে’ (২০১১) কাব্যে রয়েছে বারো থেকে সতেরো সংখ্যা। ‘জিরানকাট ও অনন্ত খেজুর গাছ’ (২০২২) কাব্যে রয়েছে তৃতীয় পর্যায়ে আঠারো থেকে বাইশ ও চতুর্থ পর্যায়ে এক থেকে পাঁচ সংখ্যা চিহ্নিত কবিতা। অগ্রন্থিত কিছু কবিতা নিয়ে পাঁচটি পর্যায়ে মোট ৩৪টি কবিতা নিয়ে এই গ্রন্থ পরিকল্পনা। দীর্ঘ কাব্যক্রিয়ায় তিনি যখন বিভ্রান্তক, হতাশ, উদ্দেশ্যহীন, আপাত কবিতায় মনের ভাব যথার্থভাবে প্রকাশ করতে অক্ষম হচ্ছেন তখনই ফিরে যান রমণীমোহনের কাছে। কখনো কখনো রমণীমোহনও কবিকে প্রত্যাঘাত করে, প্রশ্ন করে, ছুঁড়ে ফেলতে চায়। খণ্ডিত চেতনাকে কবি আবার ব্যথার উপশম দেন, শুশ্রূষা দেন।
সময়ের আত্মজিজ্ঞাসা, অব্যর্থ প্রেম, মানবতাবোধ, জীবনের সারাৎসার, ভণ্ডামি, প্রশ্নহীন সংঘাত যা জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে চলে প্রতিনিয়ত সেখান থেকে কবি ফিরতে চান। পথহীন, মন্ত্রহীন কবি জানেন পথে নামলেই পথের দিশা পাওয়া যাবে। পথে নামাটাই কবির কাজ। আর পথে নামার জন্য চিন্তাকে সর্বদা সচল রাখতে হয়। সেই সচল চিন্তা, সত্তা, অস্তিত্বকে কবি প্রতিমুহূর্তে প্রশ্ন করেন, শুধু প্রশ্নই নয় দিক নিশানা দেখিয়ে দেন। সেখানে আলো-অন্ধকার, সদর্থক-নঞর্থক, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, উদ্দেশ্য-নিরুদ্দেশের খেলা বারবার ক্রিয়া করে। সেই ক্রিয়াই এ কাব্যের যাত্রাসরণি।
সন্তোষ সিংহের ‘রমণীমোহনের সঙ্গে আলাপ’ গদ্যে লেখা কিন্তু একটা ছন্দ আছে। অর্ধযতি চিহ্ন প্রয়োগে ক্রমাগত বহমানতা আছে। মহাকালের তরঙ্গকে তিনি খণ্ড খণ্ড করেছেন ঠিকই কিন্তু উপস্থাপনে বিরাম নেননি। এমনকি তা ক্লান্তিকর নয়। বরং অনেকবেশি তীব্র মধুর, দীক্ষিত সৌন্দর্যে ভরপুর। হরেকরকম শব্দ, ব্যঞ্জনা, প্রশ্ন, সংশয়, জিজ্ঞাসা-প্রতিজিজ্ঞাসা, রোমন্থন মিলে জীবনের ধারাপাতকে যে অনন্ত মায়ায় বেঁধে দেন তা সত্তাকে কেবলই আলোকস্তম্ভে নিয়ে যায়। পরাজিত, হতচেতন সত্তাকে তিনি কেবল পাক খাওয়ান, প্রস্তরীভূত মায়ায় জীবনের অনন্ত সত্যকে বেঁধে দেন। আলোকতীর্থের সন্ধানী পথে নেমে দেখেন নিগূঢ় অন্ধকার। পলাতক মায়ায় তিনি পরাজিত হতে চান না। জীবনযুদ্ধের অগ্রণী সৈনিক হিসেবে রমণীমোহনকে জীবন বোঝান। জীবনের বিষ, হলাহল রোমন্থন করে সত্যসন্ধানী পথ অঙ্কনই এ কাব্যের অন্বিষ্ট সত্য।
রমণীমোহন সিরিজ কবি অনেকটা সময় ধরে লিখেছেন। ফলে সময়ের জিজ্ঞাসা প্রতিমুহূর্তে বদলে গেছে। চতুর্থ পর্যায়ে চাকরি চুরি, করোনা, আমফান, সীমান্তযুদ্ধ, লকডাউন, ভোট চুরি, লোভের ভাইরাস নিয়ে তিনি সরব হন। এখান থেকে মানুষের মুক্তি কীভাবে? স্বপ্নদ্রষ্টা কবি এতকাল যে জিজ্ঞাসা ও প্রত্যয়লিপি গড়ে তুলেছিলেন, শুভবোধ, মূল্যবোধের পাঠ নির্মাণ করেছিলেন তা আজ আরো অন্ধকারে সমাহিত। কবি কী করবেন? আহত খঞ্জনার মতো রমণীমোহনকে প্রশ্ন করে যান। সময় যখন নিজেই গোলকধাঁধায় আক্রান্ত, শত বেদনায় ছিন্ন, লঘুতার বেড়াজালে সীমাবদ্ধ তখন ক্রমাগত প্রশ্নই বোধহয় চিন্তার দুয়ার খুলে দিতে পারে। সেই কাজটাই করেছেন সন্তোষ সিংহ। আত্মজিজ্ঞাসার প্রত্যয়লিপি দ্বারা সময়কে সৎ, মূল্যবোধের আলোয় ফিরয়ে আনার প্রাণবন্ত অঙ্গীকার কাব্যের মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে।
পঞ্চম পর্বে প্রেম-যৌনতা-ভালোবাসা-ভালোবাসার দীনতা-ঘৃণা-আকর্ষণ মিলেমিশে জীবনের দাবিকে প্রতিষ্ঠা দিতে চেয়েছে। শিল্পী যৌনতায় সৌন্দর্য খোঁজেন। সন্তোষ সিংহের ‘হে মধুর’ কাব্য পড়লে যৌনতার সৌন্দর্য, ভালোবাসার ব্যঞ্জনা কত প্রখর তা বোঝা যায়। তিনি ভালোবাসাকে যৌনতার আলিঙ্গন থেকে পৃথক করেননি। বরং যৌনতার অলিন্দ দিয়ে, নারী-পুরুষের দেহের দাবিকে স্বীকৃতি দিয়ে ভালোবাসার আয়ুধ খুঁজেছেন। সন্তোষ সিংহের ব্যক্তিগত জীবনপাঠ জানা থাকলে পাঠক বুঝবেন ভালোবাসার জন্য তিনি শুধু গৃহছাড়া নন, মৃত্যু কিনারে পৌঁছে গিয়েছিলেন। সেই উপলব্ধি, সেই মায়াজাল, সেই অভিজ্ঞতাকে তিনি কাব্যদেহে ভাসিয়ে দেন। প্রেমজ বাসনা, আকাঙ্ক্ষা, শর্তহীন ভালোবাসা, ভালোবাসার আলো-ছায়া ধরে জীবননদীর মোহনায় পৌঁছতে চান। সেখানে শব্দের হরেকরকম বিন্যাস, আঞ্চলিকতার সুঘ্রাণ, লোকগানের সুর মিলিয়ে বৈশ্বিক সভ্যতার চিরন্তন সত্যকে বহমান করে চলেন।
যে কবি একদিন রমণীমোহনকে পরামর্শ দিয়েছিলেন—“মাত্রাজ্ঞান তোমার একান্ত জরুরি” সেই কবিই সময়ের ব্যবধানে লিখছেন—“মাল না ঢাললে তুমি চাকরি পাবে না”। সময়ের সংরূপ বদলে কবির ক্লেদ বিষণ্ণতা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি সময়ের অব্যর্থ রহস্য প্রকাশ করে দেন। যে কবি লিখেছিলেন—“মানবিকতা মানবতার চেয়ে বিপ্লব অনেক বড়” সেই কবিই পরাক্রান্ত বাস্তবক্ষেত্রে একদিন দেখেন—“অথচ দহন চলে, দ্রোহ-স্বপ্ন পুড়ে ছাড়খার”। গত শতকে কবি সামাজিক মূল্যবোধ, নীতিশিক্ষা, আদর্শচেতনা, শুভবোধের পাঠ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এ শতকে বিশ্বায়ন, পুঁজিবাদ, ভোগবাদে সেই সামাজিক জ্ঞান অচল হয়ে গেছে। বিংশ শতকের মানুষ থেকে একুশ শতকের মানুষ পৃথক। কাব্যক্রিয়াও বদলে যায়। সমগ্র ধারণা যখন ভেঙে যাচ্ছে, খণ্ড বিশ্বে যখন টুকরো টুকরো সত্তা বড় হয়ে উঠছে তখন শুনতে পাই—“কোন গ্রহদোষে সমগ্রের বিগ্রহ ভেসে যায়, রমণীমোহন”। একুশ শতকের পৃথিবী জাতপাত, ধর্মীয় বিদ্বেষ, শ্রেণি সংকট, বিভাজনের রাজনীতিতে মত্ত। প্রান্তকে ব্যবহার করে প্রান্তের নিজস্ব সত্তা ফুরিয়ে দিচ্ছে। নানক, চৈতন্য, রবীন্দ্রনাথের দেশে এ দৃশ্য দেখে কবি ব্যথিত চিত্তে লেখেন—“ভাসানের মৈষাল কাঠাম যেন বিদ্রুপের দাঁত, জেগে থাকে ট্রাইবাল জলে, এ কোন রূপান্তরকামী নিপাতনে সিদ্ধ সময়, কালের আশ্চর্য চিরাগ, বাল্মীকি আলোগুলি নিভে গিয়ে জেগে উঠেছে রত্নাকর দৈত্যের ধোঁয়াশা।” পাঠক শব্দ প্রয়োগ, উপমা, ব্যঞ্জনা লক্ষ্য করুন। শব্দের মাধুর্য নির্মাণ, কাব্য শরীরের মেদহীন নিটোল গড়ন, নান্দনিকতার মুহুর্মুহু পরিসর বদলে সন্তোষ সিংহ একুশ শতকের এক অগ্রগণ্য কবি। শব্দের মায়া, অর্থের ব্যঞ্জনা, দীর্ঘ সুরের প্রাবল্য ও মণিকাঞ্চন যোগে কাব্যদেহে সংশ্লিষ্ট সৌরভের এক দীক্ষিত পুরোহিত সন্তোষ সিংহ।
কলম হাতে কবিতায় যে সৌন্দর্য-মাধুর্য-রোমান্টিকতা-মানবতা-প্রেমধর্মের জয়গান একদিন তিনি গাইতে চেয়েছিলেন, এমনকি গেয়েছিলেন সময়ের বিবর্তনে সেই কলম ক্রূর বিধ্বংসী খতরনাক হয়ে উঠেছে। সময়ের দাবি কবিকে আর প্রেমের বাঁশি বাজাতে দেয়নি, ভালোবাসার সাগরে ডুবে মণিমুক্তা আহরণ করতে দেয়নি। এই কাব্যক্রিয়ার বদল কীভাবে ঘটে গেল কবি নিজেও জানেন না, শুধু পরিবর্তিত রসভাস চেয়ে চেয়ে দেখেন—“যে ব্রজের যমুনা নায়ে এতকাল দোল খেতে খেতে কবিতার বাঁশি হাতে স্বপ্ন দেখেছি, আজ তার রাগী ঢেউ অবাধ্য সিংহের কেশর, জলে ভাসে সাধের বাঁশরি, জলে শুধু রাধাবর্ণ ঘ্রাণ, জলে শুধু ঝিলমিল তারা-বালি, ভুয়ো প্রোফাইলের লাল চেলি।”
শ্বাসরুদ্ধ চলমান গদ্যে রমণীমোহন বয়ে গেছে তিস্তা ধরলার বুক থেকে ডাকাতিয়া বাঁশি সুরে ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে’ সীমান্তে। রমণীমোহনের তরঙ্গ অনাকাঙ্ক্ষিত অভিলাষের শব্দযান। নিরুদ্দেশ অভিযানের বদলে কবি ভ্রষ্ট পৃথিবীর মাত্রা গণনায় শুধু খতরনাক তীরন্দাজ নয় মানবপ্রেমে পরাজিত এক ব্যাধ। দুঃখের অনল থেকে, হতাশা-ক্রোধের বিষবাষ্প থেকে তিনিই অগ্নিঋষি, তিনিই যজ্ঞের হুতাগ্নি। রমণীমোহন তার চেলাকাঠ। প্যাঁচালো আঁশ বৃক্ষে কুড়োল যেমন বারবার প্রত্যাঘাত খায় রমণীমোহনও তেমন কাঠুরিয়া রূপী কবিকে জানিয়ে যায় সময়ের শরীর সহজ নয়। কুড়োল সাবধানে ফেলো। বৃক্ষ শরীরের এই যুগপৎ ক্রিয়াই যেন মানবদেহে ফিরিয়ে আনেন বাংলা কাব্যের অতন্দ্র প্রহরী সন্তোষ সিংহ।
রমণীমোহনের সঙ্গা আলাপ। সন্তোষ সিংহ। আইডিয়া প্রকাশন, রংপুর। প্রথম প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০২৫। মূল্য ১০০ টাকা।

পুরুষোত্তম সিংহ
লেখক ও গবেষক, উত্তর দিনাজপুর, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
Views: 0