| | ০ মন্তব্য

লেখক: সাকিল মাসুদ

বাংলাদেশের শিক্ষা, গবেষণা ও সাহিত্যের পরিমণ্ডলে এক উজ্জ্বল নাম বেগম জাহান আরা। শিক্ষক, কথাসাহিত্যিক এবং ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে তিনি সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৫২ সালের রাজশাহীর ভাষা আন্দোলনে মিটিং-মিছিলে সরাসরি অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই তাঁর জীবনের প্রথম বড় সংগ্রামী পদক্ষেপ শুরু হয়। পরবর্তীকালে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং দেশে ফিরে নিরলস গবেষণা, প্রবন্ধ, গল্প ও উপন্যাস রচনার মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন এক অনন্য সৃজনশীল সত্তা।

১৯৭৯ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের কথা ছিল বিদেশিদের জন্য তাঁর প্রথম গ্রন্থ। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত অয়নাংশ ছিল তাঁর প্রথম উপন্যাস। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন।

শৈশব ও পরিবার:

১৯৩৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন বেগম জাহান আরা। তাঁর বাবা মুহাম্মদ আজিজুর রহমান ছিলেন চাকরিজীবী, আর মা হাসিনা খাতুন ছিলেন পাঠানুরাগী। বাবার চাকরির কারণে শৈশব কেটেছে রাজশাহীর হাতেম খান পাড়ায় এক ধর্মপরায়ণ ও একান্নবর্তী পরিবারে। সাত ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন একমাত্র বোন। পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সংগীতচর্চা তাঁদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ছিল।

শিক্ষা ও সংগ্রাম:
নারীর জন্য শিক্ষা ছিল দুষ্প্রাপ্য বিষয়। যা তাঁর ক্ষেত্রেও ছিল এক। অল্প বয়সেই বিয়ের কারণে পড়াশোনায় বাধা এলেও তিনি থেমে থাকেননি। প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন রাজশাহী জুনিয়র মাদ্রাসায়, মাধ্যমিক শিক্ষা রাজশাহী পিএন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে। ১৯৫৫ সালে আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর পারিবারিক চাপে বিবাহিত জীবন শুরু হলেও শিক্ষার প্রতি তাঁর অদম্য আগ্রহ কখনও থেমে যায়নি।

১৯৬৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএ সম্পন্ন করেন। ১৯৭৩ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বি.এড. (প্রথম শ্রেণি) এবং ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিষয়ে এম.এ. (প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান) অর্জন করেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান ভারতে। ১৯৮০ সালে পুনে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞানে এম.এ. এবং ১৯৮২ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল Pronominal Usage and Appellatives in Bangla।

বাংলার পাশাপাশি তিনি জাপানি, এসপেরান্তো ও জার্মান ভাষায়ও স্বল্পমেয়াদি কোর্স করেন। সংগীতে অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় রেখে ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময় সারা পূর্ব পাকিস্তানে সংগীতে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন।

কর্মজীবন ও অবদান:
১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে সহযোগী অধ্যাপক, অধ্যাপক ও পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে অবসর গ্রহণ করলেও কর্মজীবন শেষ হয়নি। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি শিক্ষানীতি প্রণয়ন, নারী সংগঠন, সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

জাতীয় মহিলা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক (১৯৮৩–৮৭) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৮৫ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে বিশ্বনারী সম্মেলনে যোগ দেন। সরকারি প্রতিনিধি হয়ে মালদ্বীপ, ভারত, চীন, কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ডসহ বহু দেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৯৪–৯৬ সালে চীনের বেইজিং-এ ‘চীন আন্তর্জাতিক বেতার’-এর বাংলা বিভাগে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। একইসাথে বেইজিং ব্রডকাস্টিং ইনস্টিটিউটে চীনা শিক্ষার্থীদের বাংলা শেখান। ২০০০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে বাংলা ভাষা শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

অবসর-পরবর্তী সময়ে ২০০৭–২০১৪ পর্যন্ত ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডজাংক্ট প্রফেসর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি প্রায় চার দশক ধরে রেডিও ও টেলিভিশনে অনুষ্ঠান পরিচালনা ও গান পরিবেশন করেছেন।

সাংবাদিকতা:
বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকতা নারীর জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হলেও তিনি সেখানে অসাধারণ অবদান রাখেন। ১৯৭০ সালে সোনার বাংলা সাপ্তাহিকের মহিলা পাতার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে বাংলার বাণী ও দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক ও মহিলা পাতার সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। এছাড়াও বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত উপসম্পাদকীয় ও সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ লেখেন।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি:
রাজনৈতিক বৈরী মতের কারণে বেগম জাহান আরা তাঁর প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পাননি। তিনি রোকেয়ার যোগ্য উত্তরসূরী এবং নারী ভাষা সংগ্রামী হিসেবে একুশে পদকের দাবিদার ছিলেন। ভাষা নিয়ে তাঁর গবেষণা ও কার্যকলাপ ছিল অসাধারণ কৃতিত্বপূর্ণ, কিন্তু রাষ্ট্র তাঁকে মূল্যায়নে কৃপণতা দেখিয়েছে। বাংলা একাডেমির বানান রীতি নিয়েও তিনি কাজ করেছেন, তবে একাডেমির প্রস্তাবিত রীতিকে “লেজেগুবরে অবস্থা” বলে উল্লেখ করে আরও সরলীকরণের পক্ষে মত দেন। এর ফলে বাংলা একাডেমির সাথে তাঁর সম্পর্ক বৈরী হয়ে ওঠে।

তবুও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিনি বহু সম্মাননা অর্জন করেন। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের সম্মাননা ক্রেস্ট, দেওয়ান মো. আজরফ ফাউন্ডেশনের স্বর্ণপদক, লেখিকা সংঘ পদক, কেন্দ্রীয় লালন পরিষদের সাহিত্যে স্বর্ণপদক, বঙ্গমাতা পরিষদের ভাষাসৈনিক পুরস্কার, কমর মুশতারী স্মৃতি পুরস্কার এবং ‘চয়ন’ সাহিত্য পুরস্কার। সংগীতে তিনি অর্জন করেন ১০টি স্বর্ণপদক ও ২০টি রৌপ্যপদক।

সাহিত্য ও উত্তরাধিকার:
তাঁর জীবনী বুঝতে হলে অয়নাংশ পড়তে হবে—এমনটাই বলতেন তিনি। শতাধিক প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে শেষ জীবনে প্রকাশিত গ্রন্থগুলো আইডিয়া প্রকাশন, রংপুর থেকে প্রকাশিত হয়। উপন্যাস— উজান ভাটি , অভিবাসী, কত অচেনারে, গল্পগ্রন্থ— ভার্চুয়াল প্রেম, গবেষণামূলক— প্রমিত বাংলা বানান সমস্যা প্রসঙ্গ, এবং রোকেয়া দর্শনভিত্তিক গ্রন্থ— রোকেয়া। শেষ বই প্রকাশের সময় তিনি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলেছিলেন, এ বই তাঁকে রোকেয়া পুরস্কার এনে দেবেই। অন্ধ রাষ্ট্র হয়ত জানেনই না। তাঁর সে বইয়ের কথা।

ব্যক্তিত্ব ও উত্তরস্মৃতি:
বেগম জাহান আরা ছিলেন অসাধারণ প্রাঞ্জল লেখক। তাঁর উপন্যাসের চরিত্রগুলো পাঠকের জীবনের সঙ্গে মিশে যায়। তিনি উদার, স্পষ্টবাদী এবং নীতিতে অটল ছিলেন। রংপুরের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ টান। প্রায়ই বলতেন, শরীর সুস্থ হলেই তিনি রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন, প্রমিত বাংলা বানান নিয়ে আলোচনা করবেন, লেখকদের সঙ্গে বসে মতবিনিময় করবেন। বিশেষ করে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাথে।

১২ মে ২০২৩ সালে জার্মানিতে তিনি পরলোকগমন করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য হারালো এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, আর আমরা হারালাম এক আলোকবর্তিকা। আজ ছিল তাঁর জন্মদিন। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

✍️সাকিল মাসুদ
০১ মে ২০২২

Views: 0

বিভাগ: জীবনী, প্রবন্ধ/নিবন্ধ

লেখক সম্পর্কে

ISBN: