সাকিল মাসুদ
দশ বছরের এক কিশোর বাবার সাথে কলকাতার রাস্তায় যেতে যেতে মাইলফলক দেখে শিখে নিয়েছিল ইংরেজি অঙ্ক। কলকাতার ইংরেজি স্কুলে ভর্তি নিতে চাইছিলেন না শিক্ষক। তাঁর বাবার অনুরোধে শিক্ষক মহোদয় পরীক্ষা নিলেন। মুহূর্তের মধ্যেই কিশোরটি অঙ্কটি সমাধান করে ফেলেছিল।
সে কিশোর পরবর্তীকালে সংস্কৃত শিক্ষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করে বাংলা ভাষার জন্য সাজিয়েছিল বর্ণমালা, সহজ করেছিল ব্যাকরণ। তাঁর প্রণীত বর্ণপরিচয় তখন থেকেই শিশুদের হাতে হাতে শিক্ষার প্রথম বই হয়ে উঠেছিল।
সমাজের কুসংস্কার দূর করার জন্য তিনি কাজ শুরু করেছিলেন। রাজা রামমোহন রায়ের অসম্পূর্ণ কাজকে পূর্ণতা দান করেছিলেন হিন্দুদের শাস্ত্রসম্মত বিধবাবিবাহ আইন (১৮৫৬) প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে।
সমাজে নৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে তিনি আপোষ করেননি— এমনকি নিজের সন্তান ও পিতার সাথেও। নারীশিক্ষার বিস্তারে তিনি কলকাতা ও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বহু বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন।
জীবনের শেষ আঠারো বছর তিনি কাটিয়েছিলেন সাঁওতালদের সাথে। স্বজনদের ছেড়ে তিনি বাস করেছিলেন সিধু-কানুর সাঁওতাল পরগণার জামতাড়ার কারমাটার গ্রামের নন্দনকানন বাংলোতে। সেখানকার দরিদ্র সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সেবায় তিনি নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন।
তিনি ছিলেন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে তাঁর জন্ম হয়েছিল। ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই, ৭০ বছর বয়সে তিনি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছিল সর্বত্র।
বিদ্যাসাগর সম্পর্কে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—
“দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রের প্রধান গৌরব— তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষত মনুষ্যত্ব।”
আসানসোলের কাছেই ছিল চুরুলিয়া, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের আবাসভূমি।
আর সেই সময়ে শুরু হয়েছিল বিদ্যাসাগর লিটিলম্যাগ ও গ্রন্থমেলা।
আয়োজকদের সাথে বিদ্যাসাগরের নন্দনকানন বাড়ি ভ্রমণকালে জেনেছিলাম, জামতাড়ার এই অঞ্চলে দেশভাগের আগে বহু বিত্তবান মুসলিম পরিবার বাস করতেন। ১৯৪৭-এর দেশভাগের সময় তারা ভিটেমাটি ছেড়ে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশে) চলে গিয়েছিলেন। তাঁদের পরিত্যক্ত বাড়িগুলোর ধ্বংসাবশেষ তখনও টিকে ছিল, অতীতের সাক্ষী হয়ে।
Views: 0