গাঁজার শহর নওগাঁ: উত্থান, নিষেধাজ্ঞা ও উত্তরাধিকার
সাকিল মাসুদ, রংপুর
নওগাঁ— একটি শহর যার ইতিহাস শুধু ধান-চাল, নাগফজলি আম, প্যারাসন্দেশ, বালুঘরা দই, মাতাজির রসগোল্লার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এশিয়ার বৃহত্তম এবং বিশ্বের অন্যতম উৎকৃষ্টমানের গাঁজা উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবেও একসময় খ্যাতি অর্জন করেছিল এই জনপদ। নওগাঁর গাঁজার ইতিহাস শুধুই একটি কৃষিপণ্যের উৎপাদনের ইতিহাস নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে।
মুক্তির মোড়ে অবস্থিত গাঁজা সোসাইটির মূল ভবনটি কলকাতার রাইটার্স ক্লাবের আদলে নির্মিত। ১৯১৯ সালে ১ ডিসেম্বর ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এস. সি. মুখার্জি, ই.সি.এস (ICS) কর্মকর্তা, শুল্ক ও লবণ বিভাগের কমিশনার, বেঙ্গল। এবং নির্মাণ শেষে ১৯২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি “নওগাঁ গাঁজা চাষী সমবায় সমিতি লিমিটেড”র অফিস ভবনটি উদ্বোধন করেন বঙ্গ সরকারের মন্ত্রী নবাব সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরী, সি.আই.ই., খান বাহাদুর।
নওগাঁর গাঁজা চাষের এই ঐতিহ্য ও উৎপাদনের সূত্রপাত নিয়ে নানান তর্ক-বিতর্ক আছে। তবে নওগাঁ অঞ্চলে গাঁজার চাষ কখন শুরু হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও স্থানীয়দের মতে, এটি বহু পুরাতন এবং বংশপরম্পরায় চলে আসা কৃষিপদ্ধতি। অন্যদিকে বিভিন্ন ইতিহাসভিত্তিক রচনার সূত্র অনুসারে, ১৮শ শতকে গাজার চাষ এই অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তবে অনেকেই দাবি করেন, তারও বহু আগে গাজা ছিল এই অঞ্চলের প্রধান ফসলের একটি।
ইংরেজ শাসনামলে গাজা চাষিদের দ্বারা “গাঁজা সোসাইটির” গঠন ও বিস্তার ঘটে। ১৯১৬ সালে ৭৩৪২টি শেয়ার হোল্ডারের অংশগ্রহণে গঠিত হয় ‘গাজা সোসাইটি’। সেসময় ২৮ বিঘা জমিতে এক পাটা হিসেবে প্রায় ৬৭,৮৪,০০৪ শতক জমিতে গাজার চাষ হতো। এটি ছিল একটি সুসংগঠিত উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ কাঠামো, যার মাধ্যমে বিশ্বের বহু দেশে রপ্তানি করা হতো নওগাঁর গাঁজা। উৎপাদনের মান ও খ্যাতির দিক থেকে নওগাঁর অবস্থান ছিল বিশ্বের মধ্যে প্রথম, আর দ্বিতীয় ছিল নেপাল।
নিষিদ্ধ ঘোষণার পরিণতি এ অঞ্চলের মানুষের ডেকে আনে এক কালো অধ্যায়ের। ১৯৮৬/৮৭ সালের দিকে আন্তর্জাতিক জেনেভা চুক্তির আওতায় এনে তৎকালীন এরশাদ সরকার দেশের মধ্যে গাঁজার উৎপাদন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এর ফলেই বন্ধ হয়ে যায় নওগাঁর বহু পুরোনো ও অর্থনীতিভিত্তিক এই কৃষিপদ্ধতি। কথিত আছে, নিষিদ্ধ ঘোষণার পর প্রায় ৭০ হাজার মণ গাঁজা ‘গাঁজা গোলা’তে সিল করে সংরক্ষণ করা হয়, যা এখনো সরকারি হেফাজতে রয়েছে।
গাঁজা মাদক হিসেবে চিহ্নিত হলেও এই অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবে ব্যাপক অবদান রাখে। স্থানীয়দের মতে গাঁজার ঔষধীগুণ বহুমাত্রিক। অন্যদিকে গাঁজা সোসাইটি শুধু এখানকার কৃষকদের সমবায়ী গড়ে তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা শিক্ষা, চিকিৎসা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। যেমন কৃর্তীপুর উচ্চ বিদ্যালয়, পাহাড়পুর গাঁজা মহল উচ্চ বিদ্যালয়, চক আথিতা উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়াও কামিনী মাধব দাতব্য পশু চিকিৎসালয় এবং বহু মসজিদ, মন্দির, হাট-বাজার স্থাপন করে তারা একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলে।
নিষিদ্ধের পর গাঁজা সোসাইটির পতনের ধারা ও বর্তমান পরিস্থিতি ইতিহাস বিলীনের পথে। ফলে বর্তমানে গাঁজা গোলাটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অধীনস্থ একটি পরিত্যক্ত প্রতিষ্ঠান। এই গোলার ভেতরে একটি মাটির চিমনি রয়েছে, যেখানে নিষিদ্ধ গাঁজার উচ্ছিষ্ট ধ্বংস করা হতো। স্থানীয় জনশ্রুতি মতে, এই চিমনির ধোঁয়া সেবন করে একসময় কিছু মাদকসেবী গোপনে গাঁজার নেশা গ্রহণ করত। ফলে মাটির তৈরি এই চিমনিটি গাজার কলকি হিসেবে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত।
গাঁজার চাষ নিষিদ্ধ হওয়ার পর নওগাঁর অনেক কৃষক অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। কেউ কেউ জীবিকা নির্বাহের তাগিদে বিভিন্ন অঞ্চলে অঞ্চলে পাড়ি জমান এবং অনেকে নেপালে গিয়ে গাঁজা চাষে জড়িয়ে পড়েন। অপরদিকে, গাঁজা সোসাইটির জমি, স্থাপনা ও অন্যান্য সম্পত্তি বর্তমানে জেলা প্রশাসনের আওতায় থাকলেও এসবের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা অনুপস্থিত। অনেক জমি ভূমিদস্যুদের দখলে চলে গেছে, কিছু লিজের নামে প্রভাবশালীদের কবলে পড়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, নওগাঁর গাঁজার ইতিহাস শুধু একটি নিষিদ্ধ দ্রব্যের নয়; এটি একটি জনপদের আত্মপরিচয়ের ইতিহাস, যা অর্থনীতি, সমাজ এবং সংস্কৃতিকে গড়ে তুলেছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। আজ সেই ইতিহাস বিস্মৃতপ্রায়, কিন্তু তার চিহ্ন রয়ে গেছে স্কুল-কলেজ, বাজার, এবং পরিত্যক্ত গোলায়। রাষ্ট্র যদি এই ইতিহাসকে শুধুই নিষিদ্ধের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে, তবে একটি জনপদের ঐতিহ্য এবং ত্যাগের স্বীকৃতি বিলুপ্তির মুখে পড়বে। প্রয়োজন একটি ঐতিহাসিক ও মানবিক পুনর্মূল্যায়নের।
তথ্যসূত্র:
১. সরেজমিনে গাঁজা সোসাইটির ভবন ও গোলা পরিদর্শন, ১০ জুন ২০২৫
২. সাক্ষাৎকার: রহমান রায়হান, গাজা সোসাইটি শেয়ার হোল্ডারের উত্তরাধিকার, ১০ জুন ২০২৫
৩. স্থানীয় গুণিজনের সাক্ষাৎকার
Views: 0