জুরাছড়ি পাহাড়ে আদিবাসীদের জীবন
সাকিল মাসুদ

১৯৬২ সালের আগের রাঙ্গামাটি ছিল একেবারেই অন্যরকম এক ভূগোল— যেন পাহাড়, নদী আর মানুষের মধ্যে এক নিঃশব্দ সহাবস্থান। তখন শহরটা জেগে উঠেছিল পাহাড়ের পাদদেশে, কর্ণফুলী নদীর কোল ঘেঁষে। আজ যে বিস্তীর্ণ জলরাশিকে আমরা কাপ্তাই লেক নামে চিনি, তার অস্তিত্ব তখন এত ব্যাপক ছিল না। পাহাড়গুলো ছিল আরও কাছাকাছি— একে অপরের গায়ে হেলান দিয়ে থাকা দুই প্রেমিক-প্রেমিকার মতো, নীরব এক গভীর বন্ধনে আবদ্ধ। এবং পাহাড়ি সেই নদী কর্নফুলি পাথরের ফাঁক গলে ধীরে ধীরে সমুদ্রের দিকে গিয়ে মিলিয়ে যেত।
কিন্তু কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের পর— অর্থাৎ কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গেই— ১৯৬২ সালের পর রাঙ্গামাটির ভূ-প্রকৃতি আমূল বদলে যায়। বাঁধের কারণে জল উপচে পড়ে পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায়, ডুবে যায় গ্রাম, পাহাড়ি মানুষের ভিটেমাটি, ফসল, কবরস্থান, স্মৃতি। সেই কৃত্রিম প্লাবনের গর্ভ থেকেই জন্ম নেয় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কৃত্রিম জলাধার— আজকের কাপ্তাই লেক। ফলে আজকের হ্রদবেষ্টিত রাঙ্গামাটির সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য মানুষের ঘরছাড়া হওয়ার দীর্ঘশ্বাস, পাহাড়ে উঠে নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম ও প্রকৃতির সাথে সংহতির ছাপ।

কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ঠিক কত মানুষের জীবন ও জীবিকায় ছেদ পড়েছিল— তার নির্ভুল হিসাব সংগ্রহ করতে পারিনি। তবে আজকের পাহাড়ি মানুষের জীবনযাপন দেখলে, এবং নদীর গতিপথ দেখলে খুব সহজেই অনুমান করা যায়, সংখ্যাটা নেহাতই কম নয়। এবং নিঃস হবার বেদনার সে তীব্রতা কতখানি। বিজ্ঞান কীভাবে মানুষের জীবে বেগ দিয়ে আবেগকে ছিনিয়ে নিয়েছে।
বাংলাদেশের বৃহত্তম ও বৈচিত্র্যময় এই পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি— প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নৃগোষ্ঠীগত বৈচিত্র্য আর ভৌগোলিক স্বাতন্ত্র্যের জন্য অনন্য। উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম, দক্ষিণে বান্দরবান, পূর্বে মিজোরাম এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি— সীমান্তঘেঁষা এই জেলাটি ২২°২০′ থেকে ২৩°৪৪′ উত্তর অক্ষাংশ ও ৯১°৫৬′ থেকে ৯২°৩৩′ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। আয়তন ৬১১৬.১৩ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় ৬,২০,২১৪ জন— এর মধ্যে পুরুষ ৩,২৫,৮২৩ জন এবং নারী ২,৯৪,৩৯১ জন।

রাঙ্গামাটি বাংলাদেশের একমাত্র রিকশাবিহীন শহর— প্যাঁ-পোঁ এবং কান ঝাঝালো জ্যামের রিকশাবহুল দেশের ভেতর এ যেন এক ব্যতিক্রম বাস্তবতা। ফলে কাপ্তাই লেককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই শহরটি দেখলে মনে হয়, যেন প্রকৃতির কোলে রাখা এক শান্ত নগরী। প্রায় ৭২৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই হ্রদ শহরের, এবং পাহাড়ি মানুষের জমকালো হৃদস্পন্দন।
ইতিহাসের পাতায় রাঙ্গামাটির নাম বদলেছে বহুবার— একসময় কার্পাস মহল (১৭১৫–১৮৬০), পরে পার্বত্য চট্টগ্রাম, আর ২০ জুন ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা। বর্তমানে এখানে ১০টি উপজেলা, ১২টি থানা, ২টি পৌরসভা, ৫০টি ইউনিয়ন ও ১৩৪৭টি গ্রাম। মজার বিষয় হলো বাংলাদেশে বিচার ব্যবস্থা থাকলেও চাকমা সার্কেল ও বোমাং সার্কেলের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত এই জেলায় এখনও জীবিত আছে হেডম্যান ও কার্বারী প্রথা— পাহাড়ি সমাজের প্রথাগত শাসন ও বিচারব্যবস্থার এক অনন্য ধারা।
রাঙ্গামাটির সবচেয়ে দুর্গম দুই অঞ্চল— পরিত্যক্ত চাকমা রাজবাড়ি এবং ঝুলন্ত ব্রিজ, অর্থাৎ পর্যটন এলাকা ঘোরার সময় জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ির ভ্রমণের পরিকল্পনা হয় আমাদের। এই অঞ্চলে নাকি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাসই প্রধান; বাঙালি জনসংখ্যা এক থেকে দুই শতাংশের বেশি নয়, বরং কমও হতে পারে। গতকালের জুরাছড়ি যাত্রা যেন প্রকৃতি আর প্রকৃতিজীবী মানুষের সঙ্গে একান্ত কথোপকথন।
রাঙ্গামাটি শহরের শদিদ মিনার ঘাট থেকে ট্রলারে চেপে কর্ণফুলী হ্রদের বুক চিরে এগিয়ে যেতে সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। ট্রলার ছুটে চলে সবুজাভা জলের বুকে। দু’পাশে উঁচু পাহাড়— কোথাও পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা টংঘর, কোথাও নিঃসঙ্গ সবুজ জঙ্গল স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে থাকা নির্জন পাহাড়। কোনো পাহাড়ের পাদদেশে মানুষ কাঠ সংগ্রহ করছে, কেউ মধু খুঁজছে। মাঝেমধ্যে দেখা যায় আদিবাসী মৎস্যজীবীরা মাছ ধরছে— তাদের নৌকাগুলো বেশ আধুনিক, চীনা প্রযুক্তিতে তৈরি।

শুভলং পার হতেই দেখা মেলে বামে আর্মি চেকপোস্ট। শুভলং পাহাড়ের জলপ্রপাত যদিও এখন চোখে পড়েনি তবে খাড়া পাথরের বুক বেয়ে বয়ে যাওয়া জল যেন স্বর্গের কোনো নিঃশব্দ দরজার মতো। যখন আমাদের নৌকা পাহাড়ের সেই সরু পথ বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল জুরাছড়ির দিকে, তখন ভাবছিলাম, স্বর্গে অনেক কিছুই হয়ত বা আছে, কিন্তু শুভলঙের প্রকৃতির এই রূপের কাছে তা নিশ্চয়ই তুচ্ছ, স্বর্গীয় আবাসের কল্পিত বিলাসিতা যত বেশি সুন্দর হোক না কেন, এর চেয়ে মনমুগ্ধকর নয় নিশ্চয়। চেকপোস্টের পাশেই শুভলং বাজার— পাহাড়ি পেঁপে, বড় সীমের বিচি, কলা, সবজি আর আদিবাসী নারীদের হাতে বোনা পোশাক। পর্যটকের ভিড় এখানে গিয়ে থামে। এর ওপারে যাওয়ার অনুমতি সীমিত।
নৌকায় আমিসহ আরও ৩০জন। বিশেষ অনুমতিতে জুরাছড়ির পথে এগোলাম। আরও একটি চেকপোস্টে দায়িত্বরত সেনাকর্মকর্তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শেষে যাত্রার অনুমতি দিলেন। জুরাছড়ি ঘাটে পৌঁছাতেই থানার ওসি-সহ তিনজন পুলিশ আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন— কারণ আমাদের সাথে অতিরিক্ত ডিআইজি কবি আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন। এছাড়াও রংপুর থেকে কবি তাপস মাহমুদ, ঢাকা থেকে কবি এবিএম সোহেল রশীদ, বন্ধু নুরুল শিপারসহ বিভিন্ন জেলার অচেনা মানুষদের সাথে অজানা সেই যাত্রার ভেতর বুদবুদ করছিল নিরাপদ এক অনুভূতি।

জুরাছড়ির ঘরবাড়ি মূলত বাঁশ আর কাঠের। লেকপাড়ে টংঘর, ভেতরে কিছু আধাপাকা ও গোটা তিন-চারেক বহুতল ভবন। যার একটি ডাক বাংলো, একটি পুলিশ স্টেশন। পাহাড় কেটে তৈরি সরু রাস্তা— বড়জোর ১০–১২ ফুট চওড়া। যানবাহন বলতে হাতে গোনা কিছু সিএনজি। পুলিশও মোটরসাইকেলে যাতায়াত করেন। বাকিরা হেঁটে।
আরও মজার হলো এখানকার মানুষ সরল ও দৃঢ় নীতির। দামাদমি করেও জিনিস কেনা যায় তবে একদরে বিক্রি মানেই একদর— একদর বলে দরকষাকষি অপমানের শামিল। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয়, এলাকায় চুরি-ডাকাতি প্রায় নেই বললেই চলে। বাড়ির বাইরে মোটরসাইকেল ও মূল্যবাদ জিনিপত্র রেখে মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমায়।
সিএনজিতে চেপে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত বৌদ্ধমন্দিরে গেলাম। এখানেই রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধমূর্তি— যা পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম বলেও শোনা যায়। পাহাড়ের কোলে দাঁড়ানো সেই মূর্তি যেন পাহাড়, জল আর মানুষের ইতিহাসের নীরব প্রহরী।
আলী হোটেলে দুপুরের খাবারে পাহাড়ি মুরগি, কর্ণফুলীর বালিয়া ও বাটা মাছের ঝোল, কাঁচা পেঁয়াজের বেগুন ভর্তা, লাউ-কুমড়ো কুঁচিকাটা শাক— প্রতিটি পদে পাহাড়ের ঘ্রাণ, প্রকৃতির স্বাদ।
জেলা প্রশাসকের তথ্যমতে, রাঙ্গামাটিতে বসবাসকারী ১৪টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন, ইতিহাস আর প্রকৃতি মিলেমিশে এক অনন্য বাস্তবতা তৈরি করেছে। পাহাড়, হ্রদ আর মানুষের এই সহাবস্থান শুধু চোখে দেখার নয়— অনুভব করার।

রাঙ্গামাটি থেকে ফিরলাম শুধু এক দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে নয়, বরং এক গভীর উপলব্ধি নিয়ে— প্রকৃতি, মানুষ, আচরণ, বৈরীতার জ্ঞান নিয়ে। প্রকৃতি শুধু সৌন্দর্য তৈরি করে না, সে ইতিহাস বহন করে, মানুষকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়, আবার নিঃশব্দে বদলেও দেয়…
লেখক: কবি ও সম্পাদক
Views: 0