বগুড়া শেরপুরের ঐতিহ্য খেরুয়া মসজিদ
সাকিল মাসুদ
বগুড়ার শেরপুরের নিভৃত অঞ্চলে অবস্থিত খেরুয়া মসজিদ, মুঘল আমলের একটি অসাধারণ স্থাপত্য নিদর্শন। যা শেরপুরের প্রত্নতাত্বিক ঐতিহ্য। ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এই মসজিদটি আজও অক্ষতভাবে দাঁড়িয়ে আছে, ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে। মসজিদটি শুধু ধর্মীয় প্রার্থনার স্থানই নয়, বরং মুঘল স্থাপত্যশৈলী, শিল্পকলা ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুস সামাদ প্রামাণিক— যিনি দীর্ঘদিন যাবৎ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে মসজিদটির দেখাশোনা করেছেন। তিনি জানান যে খেরুয়া মসজিদটি নির্মাণ করেন মির্জা মুরাদ, যিনি স্থানীয় শাসক ছিলেন, তাকে কাজটি বাস্তবায়নে অর্থায়ন করেন আরব দেশের আগত সাধক আব্দুস সামাদ ফকির।
তার থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে, ১৫৮২ সালে আব্দুস সামাদ ফকির আরব থেকে হিজরত করে শেরপুরে এসেছিলেন। এখানে এসে তিনি মির্জা মুরাদের অনুমতি চান একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য। অনুমতি মেলে, এবং এর কিছুদিন পর মসজিদ নির্মাণ কাজ শুরু হয়। লোকবিশ্বাস ও জনশ্রুতি আছে যে, মসজিদ নির্মাণ শুরুর আগে দুইটি সাদা কবুতর এসে নির্মাণস্থলে বসে তাকে সালাম জানায় এবং মসজিদ নির্মাণকে স্বাগত জানায়। এরপর মসজিদ নির্মাণ শেষ হয়। কবুতরগুলোকে ঐশ্বরিক হিসেবে গণ্য করে তাদের জন্য মসজিদ নির্মাণের সময় ছাদের তিনদিকের দেয়ালে খোপ তৈরী করে দেয়া হয়। যা কবুতরের বাসা হিসেবে ব্যবহৃত হবে। বর্তমানে ঐ বাসাগুলোতে “শার্ক পাখি” বসবাস করছে।
মসজিদের সম্মুখে রয়েছে আব্দুস সামাদ ফকিরের সমাধি। তিনিই ছিলেন এই মসজিদের অন্যতম প্রবর্তক এবং সাধক।
খেরুয়া মসজিদ তার অসাধারণ মুঘল স্থাপত্যের জন্য পরিচিত। মসজিদটির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
তিনটি গম্বুজ – সমানুপাতিক, সুসজ্জিত এবং প্রাচীন কারুকার্যে অলঙ্কৃত। পাঁচটি দরজা – প্রশস্ত প্রবেশপথ, যা ভেতরে বাতাস চলাচল সহজ করে। দেয়ালের পুরুত্ব – মসজিদের দেয়াল প্রায় পাঁচ ফুট পুরু, যা মুঘল স্থাপত্যের দৃঢ়তার প্রমাণ বহন করে। ইটের নকশা – দেয়ালে ব্যবহৃত ইটগুলো চিকন এবং বিশেষভাবে কাটা, প্রতিটি প্রায় এক ইঞ্চির সামান্য বেশি পুরু। মসজিদের অভ্যন্তর ও বহির্ভাগে চুন-সুরকির দেয়াল এবং ইটের নকশা রয়েছে। মসজিদের সম্মুখে দরজার দুদিকে নির্মাণের ইতিহাস উর্দু ভাষায় কালো রঙের পাথরে খোদাই করা ছিল। মূল শিলালিপিটির একটি এখন জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত।
৪৪৩ বছরের পুরনো এই মসজিদে আজও নিয়মিত নামাজ আদায় করা হয়। এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। তবে ঈদের নামাজ এখানে হয় না। পবিত্র রমজান মাসে তারাবিহ নামাজও পড়ানো হয়।
মসজিদ প্রাঙ্গণে আমাদের আলাপ হয় আব্দুস সামাদ প্রামাণিক সাহেবের সঙ্গে। তিনি জানালেন, ১৯৮৮ সালে তার চাকরি হয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে। এর আগে তার পিতা এখানে কর্মরত ছিলেন। সম্প্রতি তিনি অবসর নিয়েছেন, কিন্তু এখনো তিনি এই মসজিদের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।
তার ভাষায়, “এই মসজিদটা ১৫৮২ সালে হয়েছে। মির্জা মুরাদ অনুমতি দিছে, আব্দুস সামাদ ফকির আরব থেকে আইসা এই মসজিদ বানাইছে। এখনো নামাজ হয়, জুমার নামাজও হয়।”
মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয় যেন সময় থমকে গেছে। ইতিহাস, বিশ্বাস এবং শিল্পকলা মিশে আছে এখানে। অতীতের নিদর্শন, ইটের গায়ে খোদাই করা নকশা এবং পাথরের শিলালিপি আমাদের মুগ্ধ করেছে।
এই ভ্রমণ সম্ভব হয়েছে গল্পকার ও সম্পাদক এম রহমান সাগর ভাইয়ের সৌজন্যে। তিনি আমাদের নিয়ে যান এই ঐতিহাসিক স্থানে, ইতিহাসের প্রতিটি স্তর উন্মোচন করেছেন।
এই সফরে আমার সাথে রাজশাহী থেকে এসে যুক্ত হয়েছিলেন কবি হাবিবুল ইসলাম তোতা ও রংপুরের ছড়াকার এসএম খলিল বাবু ভাই।
Views: 0