প্রান্তের নারী: নারীবাদের ছায়া ও আলো
| | ০ মন্তব্য

প্রান্তের নারী: নারীবাদের ছায়া ও আলো

সাম্য রাইয়ান

বাঙলাদেশের ভূগোলের মতো তার সমাজও স্তরে স্তরে বিন্যস্ত। এখানকার জনসংখ্যার একটি বড় অংশই গ্রামীণ ও প্রান্তিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত। এই প্রান্তিকতা কেবল ভৌগোলিক নয়—এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষাগত এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটেরও বহিঃপ্রকাশ। রাজধানী ঢাকা কিংবা বিভাগীয় শহর থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, জীবন হয়ে ওঠে ততই ভিন্ন—ধীরতর, তবে সীমাবদ্ধতায় পূর্ণ। প্রান্তিক গ্রাম, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা কিংবা সীমান্তবর্তী জনপদে নারীর জীবন এক আলাদা ছন্দে বয়ে চলে। সেই ছন্দে শোনা যায় ধান গাছের পাতায় বাতাসের শব্দ, নদীর স্রোতের গুঞ্জন, কিংবা শিশুদের হাসিখেলার আওয়াজ। কিন্তু এই সুরের পেছনে লুকিয়ে থাকে পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, এবং সামাজিক বিধিনিষেধের এক দীর্ঘ ইতিহাস। এখানে নারী মানে প্রায়শই গৃহস্থালির শ্রমে নিয়োজিত, কৃষিকাজে সহায়তাকারী, অথবা হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় অবদান রাখা মানুষ, যাদের পরিশ্রম অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত শক্ত করে, অথচ যাদের অস্তিত্ব রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়।
প্রশ্ন হলো—এই নারীরা কি নারীবাদ বোঝেন? নারীবাদ চর্চা করেন? তাদের জীবনে ‘নারী’ শব্দের ধারণাটি কেমন? আমাদের শিক্ষিত শহুরে চেতনায় নারীবাদ মানে সিমোন দ্য বোভেয়ারের “One is not born, but rather becomes, a woman”—এমন একটি বাক্যের গভীরতর পাঠ, অথবা হুমায়ুন আজাদের মতো তীব্র ভাষায় পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে সরব হওয়া। কিন্তু প্রান্তিক নারীর কাছে নারীবাদ নামক শব্দটি অচেনা হলেও তার জীবনযাপনেই লুকিয়ে আছে এই তত্ত্বের অসংখ্য অনুশীলন। তার প্রতিদিনের জীবনে প্রবাহিত নারীবাদের চেতনা ও প্রয়োগ—কখনো সচেতনভাবে, কখনো অবচেতনে।
প্রান্তিক নারীরা সচেতনভাবে নারীবাদ নিয়ে আলাপ না করলেও তারা প্রতিদিন এক অদৃশ্য নারীবাদী সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। সংসারের আয়-ব্যয়ের ভার, স্বামী বা পুত্র বিদেশে গেলে জমি চাষ, বাজারে যাওয়া, সরকারি দপ্তরে ঘুরে ভাতা বা সহায়তার জন্য আবেদন—এসব কর্মকাণ্ড নারীবাদী স্বাধীনতার ঘোষণা নয় বটে, কিন্তু এটি সেই স্বাধীনতারই প্রাত্যহিক রূপ।
হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন, “নারীকে মানুষ ভাবতে শেখাই হলো নারীমুক্তির প্রথম শর্ত”। এই প্রান্তিক নারীরা প্রতিদিন নিজেদের মানুষ প্রমাণ করছেন, এমনকি সেই সমাজের চোখে যেটি তাদের মূল্যায়ন করে কেবল ‘স্ত্রী’ বা ‘মা’ হিসেবে। তারা বেঁচে থাকার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজস্ব এক ক্ষমতায়ন অর্জন করেন—যা হয়তো বইয়ের পাতায় স্থান পায় না, কিন্তু প্রান্তিক বাস্তবতায় গভীরভাবে বিদ্যমান।
যাত্রাপুর ইউনিয়নের ভগবতীপুর চরাঞ্চলে গিয়েছিলাম ২০২৩-এর বন্যার পর। চরপথ ভিজে, হাঁটুর কাছে কাদা জমে আছে। মমতাজ নামের এক নারী—বয়স চল্লিশের কাছাকাছি—জানালেন, স্বামী তাকে ছেড়েছেন বহুদিন আগে, তার জীবন এখন তিনি নিজেই সামলান। শাক-সবজি চাষ করেন, গরু-ছাগল পালন করেন, ছেলেকে মাদ্রাসায়, মেয়েকে পাশের চরে স্কুলে পাঠান। জিজ্ঞেস করলাম—আপনি কি সন্তানদের শিক্ষাকে প্রয়োজনীয় মনে করেন? তিনি জানালেন, তৃতীয় বা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষাই যথেষ্ট।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী, গ্রামীণ নারীদের মাত্র ১৪ শতাংশ নারী ‘নারীর অধিকার’ বা ‘লিঙ্গসমতা’ নিয়ে তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা দিতে পারেন, কিন্তু প্রায় ৭২ শতাংশ নারী তাদের জীবনে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেন, যা নারীবাদী চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ তত্ত্বের ভাষা তাদের কাছে না পৌঁছালেও, অভিজ্ঞতার ভাষা তাদের ভেতরে নারীবাদকে বাঁচিয়ে রাখছে।
তবে বাস্তবতার দিক থেকে এই চর্চা মোটেও সহজ নয়। প্রান্তিক নারীরা শিক্ষার সুযোগে বঞ্চিত। ২০২৩ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে দেখা যায়, গ্রামীণ নারীদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৬৪ শতাংশ হলেও মাধ্যমিকের পর শিক্ষার হার মাত্র ২৬ শতাংশ। উচ্চশিক্ষায় এই হার ১০ শতাংশেরও কম। উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা চরাঞ্চলে দেখা হয়েছিল আলেয়া নামের এক বিধবার সঙ্গে। বাবার জমি ভাইদের দখলে চলে যাওয়ার পর তিনি বললেন, তিনি জানতেনই না মেয়েরাও বাবার জমি পায়। জানলে জমি লিখে দিতেন না। এই অজ্ঞতাই পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আবার শুধুমাত্র অজ্ঞতাই নয়, অনেক নারী আইন সম্পর্কে ধারণা রাখেন, কিন্তু তার কাছ থেকেও জবরদস্তিমূলকভাবে সম্পত্তি লিখে নেয়া হয়৷ সামাজিক ও মনস্তাত্বিক চাপ তৈরির মধ্য দিয়ে কাজটা অনায়াসে ঘটে৷
একথা সত্য যে, শিক্ষা না থাকায় তাদের অধিকার সম্পর্কিত জ্ঞান সীমিত থাকে। আইন, স্বাস্থ্যসেবা, উত্তরাধিকার—এসব ক্ষেত্রে তারা প্রায়শই পরিবার ও গ্রামের পুরুষদের ওপর নির্ভর করেন। এর ফলে তারা নিজেদের অধিকারের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে লড়াই করার সুযোগ কম পান।
ধর্ম ও সংস্কৃতি প্রান্তিক নারীর জীবনে একইসঙ্গে আশ্রয় ও সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। ধর্মীয় অনুশাসন অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীর গৃহবন্দি অবস্থাকে স্বাভাবিক করে তোলে। গ্রামীণ এলাকায় এখনো প্রায় সব পরিবারই বিশ্বাস করে—নারীর আসল দায়িত্ব সংসার সামলানো, সন্তান জন্ম ও প্রতিপালন, এবং স্বামীকে সেবা করা। সিমোন দ্য বোভেয়ার লিখেছিলেন, “তার ডানা কেটে দেওয়া হয়, তারপর তাকে উড়তে না জানার জন্য দোষী করা হয়।” প্রান্তিক নারীর ক্ষেত্রেও এই চিত্র স্পষ্ট—সুযোগ না দিয়েই তাদের উপর অক্ষমতার দায় চাপানো হয়।
অর্থাৎ, নারীর জীবনকে যে সীমারেখা ঘিরে রাখে, তার বড় অংশই ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও লোকাচারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। ফলে অনেক নারীর কাছে ‘ভালো নারী’ মানে বিনয়ী, গৃহস্থালিমুখী, স্বামী ও সন্তানের যত্নে নিজের জীবন উৎসর্গ করা।
তবে একই সঙ্গে দেখা যায়, ধর্মীয় বা সামাজিক কাঠামোর ভেতর থেকেই তারা কিছু জায়গায় নিজস্ব ক্ষমতার ক্ষেত্র তৈরি করতে চেষ্টা করেন। যদিও এক্ষেত্রে সফলতার হার অনুল্লেখযোগ্য৷
অর্থনৈতিক অবস্থা প্রান্তিক নারীর অবস্থান নির্ধারণে কিছুটা ভূমিকা রাখলেও এই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তার সামাজিক স্বাধীনতা বয়ে আনে না। ক্ষুদ্রঋণ, এনজিও, কিংবা গার্মেন্টসের কাজ—এসব অনেক নারীর হাতে টাকা এনে দিয়েছে। কিন্তু তারা চাইলেও সবসময় টাকা নিজের হাতে রাখতে বা নিজের ইচ্ছেমতো ব্যয় করতে পারেন না৷ কখনো স্বামী, ভাই বা কখনো পিতা সে অর্থ নিয়ে নেয়৷ আবার অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ সবসময় ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সমার্থকও নয়। তবুও, সংখ্যায় নগন্য হলেও কিছু নারী অর্থোপার্জন করছেন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলছেন—গ্রামীণ সমাজে যা একসময় অকল্পনীয় ছিল। কিছুক্ষেত্রে দেখা যায়, পুরুষরা নারীদের অর্থোপার্জনেও বাধা দেন৷ তারা মনে করেন, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে গেলে নারীকে আর আটকে রাখা যাবে না৷
নারীবাদের সত্যিকার অনুশীলন এখানে প্রায়শই অদৃশ্য। ভোরে খেতের কাজে যাওয়ার আগে সন্তানদের স্কুলে পাঠানো, বাজারে গিয়ে নিজের ফল-সবজি বিক্রি করা, বা স্বামীর অনুপস্থিতিতে গ্রামীণ শালিসে উপস্থিত হওয়া—এসবই নারীবাদী চেতনার একধরণের বহিঃপ্রকাশ। এই নামহীন নারীবাদ বেঁচে থাকে ছোট ছোট সিদ্ধান্তে, দৈনন্দিন টিকে থাকার বুদ্ধিতে, আর ধৈর্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রতিরোধে।
তবে সীমাবদ্ধতাও প্রবল। আইনগত সুরক্ষা দুর্বল—অনেক নারী জানেনই না যে তারা আইনত স্বামীর সম্পত্তিতে অংশীদার, বা কর্মক্ষেত্রে হয়রানি প্রতিরোধে তাদের অধিকার আছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তারা প্রায় অদৃশ্য। ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরা থাকলেও, অধিকাংশ সিদ্ধান্ত প্রভাবশালী পুরুষ সদস্যরাই নেন, কখনোবা নামে একজন নারী সদস্য হলেও কাজ করেন তার স্বামী।
পরিবর্তন যদিও ধীরে আসে, তবুও তা স্থায়ী হয়। গত দশ বছরে প্রান্তিক এলাকায় কিশোরী বিয়ের হার কিছুটা কমেছে। ২০০৮ সালে যেখানে ১৫-১৭ বছর বয়সে বিয়ের হার ছিল ৬৪ শতাংশ, ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৮ শতাংশে (ইউনিসেফ তথ্য)। অনেক পরিবার এখন মাধ্যমিক শেষ না করলে মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছে না।
প্রান্তিক নারীর কাছে ‘নারী’ মানে একসাথে অসংখ্য ভূমিকা পালন করা—মা, স্ত্রী, শ্রমিক, কৃষিজীবী, রোগী, সেবাদাতা। এই বহুমুখী ভূমিকার মধ্যে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রায়শই হারিয়ে যায়। তারা নারীর স্বাধীন অস্তিত্বের বদলে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের ভেতরেই নিজের পরিচয় নির্মাণ করেন।
বাঙলাদেশের প্রান্তিক নারীরা হয়তো সিমোন দ্য বোভেয়ার বা হুমায়ুন আজাদের বই পড়েননি, তারা হয়তো নারীবাদের তাত্ত্বিক আলোচনায় অংশ নেন না, কিন্তু তাদের জীবনযাপনেই রয়েছে নারীবাদের বহু অন্তর্নিহিত উপাদান। তারা পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে নিস্পেষিত হতে হতে ছোট ছোট প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, নিজেরা ও সন্তানের জন্য ভালো জীবন গড়তে চেষ্টা করেন। নারীবাদ তাদের জন্য একাডেমিক ধারণা নয়—এটি বেঁচে থাকার কৌশল, নিজের ও সন্তানের জন্য ভালো জীবন গড়ার প্রয়াস। তারা হয়তো জানেন না, ‘নারীবাদ’ শব্দটি ফরাসি ভাষা থেকে এসেছে, বা উনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপে এর সূচনা হয়েছিল। কিন্তু নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তারা জানেন, সমাজ মেয়েদের অন্ধকারে রাখতে চায়, বিকাশে বাধা দিতে চায়, মেয়েদের জন্য সমাজে বেড়ে ওঠা কতটা কঠিন। তাদের এই প্রতিদিনের কঠিন পরিশ্রম, ছোট ছোট প্রতিরোধ, এবং ধৈর্যের ভেতরে তারা নিঃশব্দে নারীবাদের ইতিহাস রচনা করছেন—যার কোনো স্লোগান নেই, কিন্তু যার প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে যাবে। বাঙলাদেশের আসন্ন যে সময়, সেখানে মৌলবাদ পরাজিত হবে নারীদের কাছেই৷

Views: 0

বিভাগ: প্রবন্ধ/নিবন্ধ

লেখক সম্পর্কে

ISBN: