রাজা রামমোহন রায়ের আত্মীয়সভার ভ্রূণ ও ধর্ম-দর্শনের উন্মেষ রংপুরে
| | ০ মন্তব্য

সাকিল মাসুদ

রাজা রামমোহন রায়— একটি অবিনশ্বর নাম, একটি যুগ, একটি বিপ্লব। ‘আধুনিক সমাজসংস্কারক’, কারণ তাঁর হাত ধরেই উনবিংশ শতাব্দীর ভারতে নবজাগরণের প্রথম আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত হয়েছিল। তাঁর কর্মজীবনের কেন্দ্রবিন্দু কলকাতা হলেও, তাঁর জীবনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অথচ তুলনামূলকভাবে স্বল্প আলোচিত অধ্যায় কেটেছিল উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী শহর রংপুরে। ১৮০৯ থেকে ১৮১৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর তিনি এখানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কালেক্টর জন ডিগবির দেওয়ান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রামাণ্য জীবনীগ্রন্থটি পাঠ করলে স্পষ্ট হয় যে, রংপুর কেবল তাঁর কর্মস্থল ছিল না, বরং এটি ছিল তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের এক সুপরিকল্পিত প্রস্তুতিপর্ব— এক উর্বর কর্মভূমি, যেখানে তাঁর দার্শনিক চিন্তার বীজ অঙ্কুরিত হয়ে এক মহীরুহে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। রংপুরের এই পর্বেই তাঁর ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের ভাবনাগুলি প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে। এটি ছিল তাঁর পরীক্ষার এক কর্মশালা, যা পরবর্তীকালে কলকাতার বৃহত্তর পরিসরে আত্মপ্রকাশ করে।

রংপুরে আগমন ও কর্মজীবন:
রামমোহনের জীবনের গতিপথ অনুধাবন করলে দেখা যায়, পারিবারিক রক্ষণশীল পরিমণ্ডল থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীনভাবে জ্ঞানচর্চা ও মত প্রচারের জন্য তাঁর দুটি জিনিসের প্রয়োজন ছিল— এক. ভৌগোলিক দূরত্ব এবং দুই. আর্থিক স্বনির্ভরতা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরি তাঁকে এই দুটি সুযোগই এনে দিয়েছিল। জন ডিগবির অধীনে দেওয়ান হিসেবে কাজ করার সুবাদে তিনি বিভিন্ন স্থানে কর্মরত ছিলেন, যার মধ্যে রংপুরের অস্থায়ী কেরানির চাকরি ছিল অন্যতম এবং সবচেয়ে দীর্ঘকালীন কর্মস্থল। ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে জন ডিগবি রংপুরের কালেক্টর নিযুক্ত হলে রামমোহনও তাঁর সঙ্গে আসেন এবং ১৮১৪ সাল পর্যন্ত অবস্থান করেন।¹

সেসময় রংপুরের দাপ্তরিক ভবনগুলো গড়ে উঠেছিল মাহিগঞ্জ কেন্দ্রীক। দেওয়ান গোলাম শাহ পদত্যাগ করলে তার স্থলে রামমোহনকে নিয়োগ করার জন্য ৫ ও ৩০ নভেম্বর ১৮০৯ দুটি পত্রের মাধ্যমে তাৎকালিক রেভিনিউ বোর্ডে সুপারিশপত্র লেখেন ডিগবি সাহেব। রামমোহনের জামিনদার হিসেবে বৃহত্তর রংপুরের লালমনিরহাটের কুলাঘাট জমিদার মির্জা আব্বাস আলী (মির্জা তকীর ছেলে) এবং রংপুরের জমিদার জয়রাম সেনের নাম উল্লেখ পাওয়া যায়।
ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন, এই সময়কালে রামমোহন কেবল কোম্পানির দেওয়ানি করেননি, বরং নিজস্ব ব্যবসাতেও মনোনিবেশ করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, “এই সময়ে রংপুর ও কলিকাতায় তাঁহার হিসাবপত্র রাখিত, তাহার নাম গুদাধর শোধ ও কলিকাতার তহলিদারের নাম গোপীমোহন চট্টোপাধ্যায়।”²
এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, তিনি তাঁর পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি ব্যক্তিগত আর্থিক ভিত্তিকেও সুদৃঢ় করতে সচেষ্ট ছিলেন। রংপুরের কর্মজীবন তাঁকে যে আর্থিক সচ্ছলতা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা এনে দিয়েছিল, তা-ই তাঁকে নির্ভীকভাবে নিজের মতাদর্শ প্রচারের সাহস জুগিয়েছিল। এই সময় থেকেই তিনি জাগতিক সম্পদের প্রতি এক প্রকার নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল অর্থ উপার্জন করে এমন এক অবস্থায় পৌঁছানো, যেখানে জীবিকার চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে সম্পূর্ণভাবে জ্ঞানচর্চা ও জনহিতকর কাজে আত্মনিয়োগ করা যায়। রংপুর পর্ব ছিল সেই লক্ষ্যের দিকে তাঁর এক সফল অভিযাত্রা। প্রশাসনিক কাজে নিযুক্ত থাকার ফলে তিনি ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা এবং ভূমিরাজস্ব নীতির খুঁটিনাটি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, যা তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনাকে সমৃদ্ধ করেছিল। সুতরাং, তাঁর কর্মজীবনের এই অধ্যায়টি কেবল অর্থোপার্জনের মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল তাঁর ভবিষ্যৎ বৃহত্তর কর্মযজ্ঞের জন্য এক অপরিহার্য ক্ষেত্র প্রস্তুতি।

ধর্ম, দর্শন ও আত্মীয়সভার ভ্রূণ:
রংপুরকে রামমোহনের জীবনের সন্ধিক্ষণ বলার প্রধান কারণ হলো, এখানেই তাঁর ধর্মীয় ও দার্শনিক চিন্তাভাবনা প্রথম প্রকাশ্য আলোচনার রূপ পেয়েছিল। পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে যা তাঁর ব্যক্তিগত অধ্যয়ন ও মননের স্তরে সীমাবদ্ধ ছিল, রংপুরের মুক্ত পরিবেশে তা এক সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হওয়ার পথে প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তিনি বসবাস করতেন রংপুরের তামপাট তালুকের বড় রংপুরে। তার বসবাসরত স্থানটিতে গড়ে তোলা হয়েছিল ২টি ব্রাহ্মমন্দিরের মঠ। বর্তমানে জায়গাটি মীরগঞ্জ হিসেবে পরিচিত, মন্দিরের স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে মীরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ ভবন। অবশ্য ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন না থাকায় তিনি কোন বাড়িটিতে থাকতেন এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আছে নানান সংশয়। মীরগঞ্জের ব্রাহ্মমন্দিরের মঠ ছিল কিছুদিন আগেও। স্থানীয়রা জানান, একটি মঠ ছিল বিশাল উচ্চ এবং একটি ছোট, তাদের মতে- এই মঠটি ছিল রংপুরের সবচেয়ে বড় উচ্চতার মঠ।
এই মন্দিরের সেবায়েতের দায়িত্বে ছিলেন বিপীন চন্দ্র ও ভূবন চন্দ্র দুই ভাই। দেশভাগের সময়ে তারা ভারতে চলে গেলে দায়িত্ব নেন শরৎচন্দ্র ও গোপালচন্দ্র। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, পরবর্তী সময়ে যশো মালাকর এবং তাঁর ছেলে শরৎ মালাকর মন্দিরটির দেখভালের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু ১৯৬২ সালে নগর মীরগঞ্জ ইউনিয়ন গঠিত হলে প্রথম চেয়ারম্যান ভরসা মুহুরী মন্দিরের জমি শরৎ মালাকরের কাছ থেকে ইউনিয়ন পরিষদের নামে দানপত্র নেন। পরবর্তীতে সেই জমিতে ইউনিয়ন পরিষদের ভবন নির্মিত হয়। ব্রাহ্মসমাজের অনুসারী কমতে থাকায় পরিত্যাক্ত ঐতিহ্যমণ্ডিত মঠদুটি ১৯৭৬–১৯৭৮ সালের মধ্যে ভেঙে পড়ে এবং নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
সরেজমিনে (৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫) স্থানীয় বাসিন্দা ইন্দ্র মোহন, শিক্ষক (নগর মীরগঞ্জ হাই স্কুল), তার সাথে আলাপকালে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, “৭৬–৭৮ সালের দিকে ব্রাহ্মমন্দির মঠ দুটি ভেঙে পড়ে। তারপর এর আর কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট থাকেনি।” তাঁর সাক্ষ্য থেকে বোঝা যায়, মন্দিরটির ধ্বংস কেবল ভৌত নিদর্শনের হারানো নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক অধ্যায়ের অবসান।
ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, রামমোহন রংপুরে তাঁর বাসভবনে নিয়মিত সভার আয়োজন করতেন, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম ও দর্শন নিয়ে আলোচনা হতো। তিনি লিখেছেন:
“এই সভা করিয়া তিনি প্রকাশ্যভাবে স্বীয় ধর্ম্মমত প্রচার করিতে আরম্ভ করেন। রংপুরে অবস্থানকালে সুপ্রসিদ্ধ তান্ত্রিক হরিহরানন্দ তীর্থস্বামী কুলাবধূত তাঁহার সহিত মিলিত হন। রামমোহনের সভায় অনেক জৈন মহাজনও উপস্থিত থাকিতেন। ‘আত্মীয় সভা’র ইহাই সূত্রপাত বলা যাইতে পারে।”³
এই উদ্ধৃতিটি রামমোহনের রংপুর পর্বের গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখান থেকে তাঁর কর্মের কয়েকটি প্রধান দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

১. প্রকাশ্য ধর্মমত প্রচার:
রংপুরের সভা ছিল তাঁর ধর্মমত প্রচারের প্রথম প্রকাশ্য মঞ্চ। এর আগে তিনি ব্যক্তিগত স্তরে বা লেখনীর মাধ্যমে তাঁর একেশ্বরবাদী ও পৌত্তলিকতা-বিরোধী মত প্রকাশ করলেও, একটি নিয়মিত আলোচনাচক্রের মাধ্যমে তা প্রচার করার উদ্যোগ এখানেই প্রথম নেন। এটি ছিল তাঁর চিন্তাকে ব্যক্তিগত স্তর থেকে সামাজিক স্তরে নিয়ে যাওয়ার এক দুঃসাহসিক পদক্ষেপ। সভাগুলিতে তিনি হিন্দুশাস্ত্র, বিশেষত বেদ ও উপনিষদের ভিত্তিতে একেশ্বরবাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন এবং প্রচলিত মূর্তিপূজা ও আচার-সর্বস্ব ধর্মের অসারতা তুলে ধরতেন।

২. আন্তর্ধর্মীয় সংলাপের সূচনা:
রামমোহনের সভায় কেবল হিন্দু পণ্ডিতরাই নন, জৈন বণিকদেরও উপস্থিতি ছিল বলে জানা যায়।⁴ এটি প্রমাণ করে যে, তাঁর আলোচনা কেবল হিন্দুধর্মের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল এক আন্তর্ধর্মীয় সংলাপের ক্ষেত্র। তিনি বিভিন্ন ধর্মের তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে একটি সার্বজনীন সত্যে উপনীত হতে চেয়েছিলেন। ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের একেশ্বরবাদের সঙ্গে হিন্দু বেদান্তের অদ্বৈতবাদের যে সাদৃশ্য তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন, সেই সমন্বয়বাদী দর্শনের ব্যবহারিক প্রয়োগ শুরু হয় রংপুরের এই সভাগুলিতেই। এই প্রচেষ্টা তাঁর ভবিষ্যৎ ‘ব্রাহ্মসমাজ’ প্রতিষ্ঠার ভাবনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

৩. আত্মীয়সভা’র পূর্বপ্রস্তুতি:
ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত সঠিকভাবেই রংপুরের এই সমাবেশকে কলকাতার বিখ্যাত ‘আত্মীয় সভা’র (প্রতিষ্ঠা ১৮১৫) “সূত্রপাত” বা ভ্রূণ বলে চিহ্নিত করেছেন। ‘আত্মীয় সভা’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রামমোহন কলকাতায় যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তার কাঠামো, উদ্দেশ্য এবং কার্যপ্রণালীর মহড়া সম্পন্ন হয়েছিল রংপুরের এই ছোট পরিসরে। রংপুরের সাফল্যই তাঁকে কলকাতায় বৃহত্তর ও আরও সংগঠিত উদ্যোগ গ্রহণে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল। এই সভাগুলি ছিল তাঁর সামাজিক নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতার প্রথম পরীক্ষাক্ষেত্র।

হরিহরানন্দ তীর্থস্বামীর সঙ্গ:
রংপুরে রামমোহনের দার্শনিক চিন্তার বিকাশে যাঁর প্রভাব ছিল সর্বাধিক, তিনি হলেন সুপ্রসিদ্ধ তান্ত্রিক পণ্ডিত হরিহরানন্দ তীর্থস্বামী কুলাবধূত। হরিহরানন্দ ছিলেন এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব; প্রচলিত মত অনুযায়ী, তিনি রামমোহনের পিতার বন্ধু ছিলেন এবং রামমোহনের বাল্যকাল থেকেই তাঁর ওপর হরিহরানন্দের স্নেহ ও প্রভাব ছিল।⁵ রংপুরে অবস্থানকালে এই দুই মনস্বীর সাক্ষাৎ তাঁদের পারস্পরিক জ্ঞানচর্চাকে এক নতুন মাত্রা দান করে।
তাঁদের সম্পর্ক গুরু-শিষ্যের গতানুগতিক ধারার ছিল না, বরং তা ছিল দুই সমধর্মী জ্ঞানান্বেষীর মধ্যে এক গভীর বৌদ্ধিক আদান-প্রদান। হরিহরানন্দ যদিও ছিলেন তান্ত্রিক সাধক, তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল বিশাল এবং তিনি রামমোহনের একেশ্বরবাদী চিন্তার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তাঁদের মধ্যে নিয়মিত শাস্ত্রালোচনা হতো। রামমোহন তাঁর কাছ থেকে তন্ত্রশাস্ত্রের নিগূঢ় রহস্য এবং বেদান্তের জটিল তত্ত্ব সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ করেন। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, রামমোহন রংপুরে “হিন্দুশাস্ত্র ও দর্শনালোচনা চর্চা করেন।”⁶ এই চর্চায় হরিহরানন্দের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই বৌদ্ধিক আদান-প্রদানের ফলে রামমোহনের দর্শন আরও পরিণত ও সুসংহত রূপ লাভ করে। তিনি কেবল উপনিষদের অদ্বৈতবাদের মধ্যেই তাঁর যুক্তিকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং তন্ত্রের একেশ্বরবাদী ধারা থেকেও তাঁর মতের সমর্থনে উপাদান সংগ্রহ করেন। এটি তাঁর দর্শনকে একাধারে পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও সমন্বয়বাদী করে তোলে। হরিহরানন্দের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই তিনি সম্ভবত হিন্দুধর্মের বিভিন্ন আপাতবিরোধী ধারার মধ্যে এক অন্তর্নিহিত ঐক্য খুঁজে পেয়েছিলেন। এই উপলব্ধিই তাঁকে পরবর্তীকালে একজন সফল ধর্মসংস্কারকে পরিণত হতে সাহায্য করেছিল, কারণ তিনি হিন্দুশাস্ত্রের গভীরে প্রবেশ করে তার মূল নির্যাসকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সুতরাং, হরিহরানন্দের সঙ্গলাভ রামমোহনের দার্শনিক উত্তরণের পথে এক অনুঘটকের কাজ করেছিল।

রামমোহনের কর্ম ও দর্শনের গবেষণাগার
সার্বিকভাবে বিচার করলে, রংপুরের অধ্যায়টি ছিল রামমোহনের সমগ্র জীবনের একটি গবেষণাগার। এখানে তিনি তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার প্রতিটি দিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন।

বৌদ্ধিক গবেষণা: এখানে তিনি তাঁর একেশ্বরবাদী দর্শনকে প্রকাশ্য বিতর্কের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। বিভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গে আলোচনার ফলে তাঁর যুক্তিগুলি আরও শাণিত ও পরিণত হয়। তিনি শেখেন কীভাবে শাস্ত্রীয় প্রমাণ এবং অকাট্য যুক্তির সমন্বয়ে প্রতিপক্ষের মোকাবেলা করতে হয়।

প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা: সভা বা সমিতি গঠন করে কীভাবে একটি আদর্শকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তার প্রথম পাঠ তিনি রংপুরে পেয়েছিলেন। এই সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে আত্মীয় সভা ও ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজে লেগেছিল।

সামাজিক গবেষণাগা: রংপুরের তুলনামূলকভাবে উদার পরিবেশে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, সঠিক পদ্ধতিতে মত প্রচার করতে পারলে সমাজের একটি অংশকে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগঠিত করা সম্ভব। এটি তাঁকে কলকাতার রক্ষণশীল সমাজের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে সাহস জুগিয়েছিল।

রংপুরে থাকাকালীনই তিনি তিব্বত ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন বলে জানা যায়, যার উদ্দেশ্য ছিল বৌদ্ধধর্মের মূল তত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা। যদিও এই ভ্রমণ সম্পন্ন হয়েছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, কিন্তু এই পরিকল্পনাটিও তাঁর সার্বজনীন জ্ঞানতৃষ্ণারই পরিচায়ক।⁷
জন ডিগবির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিগবি কেবল তাঁর উর্ধ্বতন কর্মচারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন রামমোহনের গুণমুগ্ধ বন্ধু। ডিগবির উৎসাহ ও অনুপ্রেরণাতেই রামমোহন ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন এবং পাশ্চাত্য দর্শন, রাজনীতি ও বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত হন। ডিগবি পরবর্তীকালে রামমোহনের ‘বেদান্ত গ্রন্থ’-এর ইংরেজি অনুবাদের ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন।⁸ রংপুরের কর্মজীবনেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের এই মেলবন্ধন ঘটেছিল, যা রামমোহনের চিন্তাধারার প্রধান বৈশিষ্ট্য।
ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনীগ্রন্থের আলোকে বিচার করলে এ কথা নিঃসন্দেহভাবে বলা যায় যে, রাজা রামমোহন রায়ের জীবনের গতিপথ নির্দেশে রংপুর পর্বের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। কলকাতা যদি তাঁর কর্মের মহাসমুদ্র হয়, তবে রংপুর ছিল সেই সমুদ্রে যাত্রার পূর্বে প্রস্তুতি ও শক্তি সঞ্চয়ের এক শান্ত অথচ গভীর পোতাশ্রয়। এখানেই তাঁর আর্থিক স্বনির্ভরতার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, তাঁর দার্শনিক চিন্তা প্রথম প্রকাশ্য রূপ পেয়েছিল, তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার উন্মেষ ঘটেছিল এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জ্ঞানধারার সার্থক মিলন শুরু হয়েছিল।
রংপুরের সভাগুলিতে যে একেশ্বরবাদের ধ্বনি প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল, তাই পরবর্তীকালে ব্রাহ্মসমাজের ব্রহ্মসংগীতে পরিণত হয়। যে যুক্তিবাদী মন নিয়ে তিনি রংপুরে শাস্ত্রের আলোচনা করতেন, সেই মনই তাঁকে সতীদাহের মতো অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হতে প্রেরণা জুগিয়েছিল। তাই রামমোহনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে যদি তাঁর রংপুর পর্বকে উপেক্ষা করা হয়, তবে তা এক অসম্পূর্ণ আলোচনা হতে বাধ্য। রংপুর ছিল সেই নেপথ্য ভূমি, যেখানে আধুনিক ভারতের রূপকার রামমোহন রায় নীরবে, নিভৃতে তাঁর ভবিষ্যৎ বিপ্লবের নীল নকশা প্রস্তুত করেছিলেন।

রংপুরে বর্তমান ব্রাহ্মমন্দির: রংপুরে অনুসন্ধান করে দুটি ব্রাহ্মমন্দিরের সন্ধান মেলে ১টি নগর মীরগঞ্জ অর্থাৎ তামপাট তালুকে, ধারণা করা হয় এটি ছিল প্রথম ব্রাহ্মমন্দির, যার কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট নেই, তবে পুকুরটি এখনও আছে। ২য় মন্দিরটি ১৯১৫ সালে একেশ্বরবাদ এবং নিরাকার বাদের পরমানুসারীরা গড়ে তুলেছিলেন রংপুর শহরে পাঁচপীর দরগার বিপরীতের “ব্রাহ্মসমাজ সমাজ মন্দির”। উল্লেখ যে, মীরগঞ্জের ইন্দ্র মোহনের মতে সদ্যপুস্করিনিতে আরও একটি ব্রাহ্মমন্দির আছে বলে জানান। সরেজমিনে মন্দিরটি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।
তবে বর্তমানে নগরীর “ব্রাহ্মসমাজ সমাজ মন্দির” নামে মন্দিরটি ১৭ শতক জমির ওপর নির্মাণ করা হয়েছিল। যা প্রায় ১শতক খানেক জমির ওপর ধ্বংসাবশেষ হিসেবে টিকে আছে। বাকি জায়গায় বিভিন্ন দোকান ঘর নির্মাণ করে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় মন্দিরের ৫ কক্ষের ১টিতে চেতনা নাট্যগোষ্ঠীর কক্ষ, ৩ অফিস ঘরে তালা ঝোলানো, ১টিতে গণতন্ত্রী পার্টির অফিস। সদর দরজায় একদিকে মুচির দোকান, একদিকে পানদোকানের রমরমা ব্যবসার কারণে ২ফুট আড়ষ্ট প্রবেশপথ। বাইরে থেকে চোখে পড়ে না সাধারণ মানুষের।
চেতনা নাট্যগোষ্ঠী ২০০০ সালের দিকে মন্দিরে নাটকের মহড়ার জন্য ব্যবহৃত হতো। পরবর্তী মন্দিরের নাটকের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মন্দির কমিটি চেতনা নাট্যগোষ্ঠীকে বিনামূল্যে ব্যবহারের জন্য অনুমতি দেয়। বর্তমানে মন্দিরটির সভাপতি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ প্রিয়াঙ্কা ও সাধারণ সম্পাদক শ্রী পুলিন চন্দ্র মোহন্ত। রামমোহন রায়ের এই ব্রাহ্ম ধর্মের জন্য। একটি অংশ গণতন্ত্রী পার্টির অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
রংপুরে ব্রাহ্মসমাজের অনুসারী সংখ্যায় কম বলে জানান, ব্রাহ্ম ধর্মানুসারী রতন কর্মকার। তিনি সনাতনী ধর্মের অনুসারী ছিলেন। রামমোহন রায়ের দর্শনপাঠে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০০৮ সালে আদালতে এফিডেফিট করে ব্রাহ্মধর্মে বিশ্বাস স্থাপন করেন। বর্তমানে রংপুরে ব্রাহ্ম পরিবারের সংখ্যা ১৭টি বলে তিনি জানান। তাদের একটি ব্রাহ্ম সমাজ কমিটিও রয়েছে। রতন কর্মকার সেই কমিটির সাধারণ সম্পাদক। তিনি অভিযোগ তোলেন, ১৯০৫ সালে নির্মিত ব্রাহ্মমন্দিরটিতে বর্তমানে রামমোহন রায়ের আদর্শ সঠিকভাবে পালিত হচ্ছে না। হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। ফলে আমাদের ধর্মমত প্রচার ও পালনে কিছুটা সমস্যাও হচ্ছে।
তার স্মরণে রংপুর জেলা প্রশাসকের সরকারি কর্মচারীগণ ১৯০৫ সালে গঠন করে “রাজা রামমোহন ক্লাব, রংপুর”। এই ক্লাবের অধিনে রাজা রামমোহন ক্লাব ও মার্কেট গড়ে ওঠে ১৯৯০ এর দশকে, নগরীর ব্রাহ্মমন্দিরের বিপরীতে। ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক বাঙালি নামে লন্ডনভিত্তিক সংগঠনের সভাপতি শামসুল হকের অর্থায়নে রাজা রামমোহন রায়ের ভবনের প্রবেশমুখ ও সিঁড়ির কাছে ম্যুরাল নির্মাণ করা হয়।

লেখক: কবি, সম্পাদক ও প্রকাশক

Views: 0

বিভাগ: জীবনী, প্রবন্ধ/নিবন্ধ

লেখক সম্পর্কে

ISBN: