লেখায় কল্পনার চেয়ে অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেন রানা মাসুদ
| | ০ মন্তব্য

সাকিল মাসুদ

স্রোতের মতোই মানবজীবন একরৈখিক নয়; এতে আছে বাঁক, মোড়, ভাঙন ও পুনর্গঠন। জীবনের প্রতিটি পর্যায় যেন একেকটি আলাদা ভূপ্রকৃতি। পাহাড়ি ঝর্ণার মতো তারুণ্যের চঞ্চলতা, যৌবনের দুরন্ত প্রবাহ পেরিয়ে মধ্যবয়স এসে দাঁড়ায় এক বিস্তৃত সমতলে— যেখানে গতি কমে, কিন্তু গভীরতা বাড়ে। নদীর যেমন কোনো আত্মজিজ্ঞাসা নেই, মানুষের জীবনে তা অনিবার্য। বিশেষ করে মধ্য ও উত্তীর্ণ বয়সে এসে মানুষ নিজেকেই নিজের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়— হিসেব মেলায় প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির, সাফল্য ও ব্যর্থতার, ভালোবাসা ও ক্ষয়ের।
এই আত্মজিজ্ঞাসাই গল্পের প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে। জীবনকে দেখা, বোঝা এবং জীবন থেকে ছেঁকে আনা অভিজ্ঞতার ভাষান্তরই গল্প। রানা মাসুদের গল্পগ্রন্থ ‘অনল নেভে না’ মূলত এই মধ্যবয়সী আত্মসমালোচনার সাহিত্যিক দলিল। এখানে গল্পের প্রতিটি চরিত্র যেন আলাদা আলাদা জীবনের পর্ব—স্বাদে, আঙ্গিকে ও মানসিক অভিঘাতে ভিন্ন। তাই এ গ্রন্থ কেবল গল্পসংকলন নয়, বরং সমকালীন মানুষের অস্তিত্বসংকটের এক বহুমাত্রিক পাঠ।
রানা মাসুদের সাহিত্যচর্চার বিশেষত্ব হলো— তিনি কল্পনার চেয়ে অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। তাঁর কবিতা, গল্প ও উপন্যাসের রসদ আসে ভ্রমণপিপাসু মন, প্রাকৃতিক ও মানবভূগোলের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফির দীর্ঘ সাধনা থেকে। সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে বাঘের ভয় উপেক্ষা করে রাত কাটানো কিংবা তিস্তার উৎসমুখে দাঁড়িয়ে নদীর জন্মদুঃখ দেখা— এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে কেবল ভ্রমণকারী নয়, বরং জীবন-পর্যবেক্ষকে পরিণত করেছে। নেপালের জাতীয় গ্রন্থাগার থেকে শুরু করে ব্রহ্মপুত্র-যমুনার চরে পাখির সন্ধান— এই যাত্রাগুলো তাঁর লেখাকে দিয়েছে ভৌগোলিক বিস্তার ও মানসিক গভীরতা।
নদী তাঁর লেখায় কেবল প্রকৃতি নয়, রাজনীতি ও মানবসংগ্রামের প্রতীক। তিস্তার পানিবণ্টন বৈষম্য, নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবনসংগ্রাম নিয়ে লেখা ‘তিস্তার আদ্যোপান্ত’ কেবল গবেষণাধর্মী গ্রন্থ নয়; এটি এক ধরনের প্রতিবাদী দলিল। এই বইয়ের জন্য ২০২৫ সালে তিনি ফিরেদেখা পদক অর্জন করেন—রংপুর অঞ্চলের সাহিত্যচর্চায় যা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
শিল্পাঙ্গনে রানা মাসুদ নামে পরিচিত হলেও তাঁর প্রকৃত নাম মো. মাসুদ রানা। ১৯৭০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রংপুর শহরের নিউ সেন পাড়ায় জন্ম। পিতা মরহুম মোজাহার উদ্দিন ও মাতা আলহাজ শিরিন বানুর সন্তান তিনি। কবিতা ও গদ্য— উভয় ধারাতেই তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। গবেষণাধর্মী কাজেও তিনি মনোযোগী। একসময় স্থানীয় দৈনিকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও ব্যবসায়িক জীবনের চাপে কিছু সময় শিল্প-সাহিত্য অঙ্গন থেকে দূরে ছিলেন। তবে সেই বিরতি তাঁকে শূন্য করেনি; বরং অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করেছে। এখন তিনি আবার লিখছেন— হাত খুলেই লিখছেন।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসমূহে রয়েছে গবেষণা, উপন্যাস, কিশোর সাহিত্য, কবিতা ও গল্প— যা তাঁর বহুমাত্রিক সৃজনশীলতার প্রমাণ। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘তিস্তার আদ্যোপান্ত’, ‘৭১-এর উত্তাল মার্চ: রংপুরের দিনগুলো’, আলোর দীপ;
উপন্যাস: ‘দূর কোন দূর ঠিকানায়’;
কিশোর উপন্যাস ‘দার্জিলিংয়ের ডোবারম্যান’, ‘কক্সবাজারের মাছলিবাবা’;
কাব্যগ্রন্থ: ‘জীবনের চার লাইন’ (১ ও ২), ‘ভালোবাসার নীল নকশা’, ‘দহনে অহনে মন’, ‘হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে’;
গল্পগ্রন্থ: ‘এভাবেই আছি ও অন্যান্য গল্প’, ‘যুবকের একটা পাপ আছে’, ‘অনল নেভে না’।
২০২৬ এর বইমেলায় প্রকাশের অপেক্ষায় আলোর দীপ ২য় খণ্ড।
বর্তমানে তিনি রংপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ ও গুণীজন নিয়ে কাজ করছেন। ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি তাঁর অন্যতম শখ; ১৯৯৭ সালে রংপুরে তাঁর একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে তিনি একজন সংগঠক— সাহিত্য, সংস্কৃতি, সামাজিক ও পেশাজীবী নানা সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত।
সব মিলিয়ে রানা মাসুদের সাহিত্যকর্মকে দেখা যায় এক ধরনের জীবনপাঠ হিসেবে— যেখানে ব্যক্তি, প্রকৃতি, ইতিহাস ও সময় একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে তৈরি করে সমকালের এক গভীর বয়ান।

লেখক: কবি, সম্পাদক ও প্রকাশক

Views: 0

বিভাগ: জীবনী, প্রবন্ধ/নিবন্ধ

লেখক সম্পর্কে

ISBN: