মৃত্যুর নয় বছর পরও অমলিন সৈয়দ শামসুল হক
| | ০ মন্তব্য

সাকিল মাসুদ

বাংলা সাহিত্য কেবল শব্দ ও শৈলীর ভাণ্ডার নয়, এটি মানুষের অস্তিত্বচর্চারও পরিসর। সেই অস্তিত্বচর্চায় যাঁরা বহুমাত্রিকতা এনেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন সব্যসাচী কবি সৈয়দ শামসুল হক। কবি হিসেবে খ্যাত হলেও উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্পসহ সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তাঁর সমান দক্ষ পদচারণা তাঁকে দিয়েছে ‘সব্যসাচী লেখক’-এর মর্যাদা।
তাঁর সৃষ্টি শৈলীতে যেমন ধরা পড়ে ইতিহাসের রক্তক্ষরণ, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, দ্রোহ ও বেদনাবোধ; তেমনি উন্মোচিত হয় প্রেম, প্রকৃতি ও মানুষের অন্তর্জগতের আদিম বিস্ফোরণ। কাব্যের নান্দনিকতা যেখানে মিলেছে নাটকের গতিশীলতার সঙ্গে, উপন্যাসের গভীর মানবচেতনা সেখানে যুক্ত হয়েছে প্রবন্ধের বিশ্লেষণধর্মিতার সঙ্গে। সৈয়দ শামসুল হক বাংলা সাহিত্যে এমন এক সেতুবন্ধন রচনা করেছেন, যা তাঁকে করে তুলেছে চিরকালীন এক দ্বীপ্ত আলো— যা কেবল সমকাল নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও দিকনির্দেশনা দেবে।
কুড়িগ্রামে জন্ম নেওয়া এই লেখক কৈশোরেই সাহিত্যের প্রতি প্রবল আগ্রহী হয়ে ওঠেন। মাত্র এগারো-বারো বছর বয়সে অসুস্থতার সময়ে প্রথম পদ লিখে তিনি যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, তা আর থেমে থাকেনি।
১৯৫১ সালে ফজলে লোহানী সম্পাদিত অগত্যা পত্রিকায় প্রকাশিত “উদয়াস্ত” গল্পের মাধ্যমে সাহিত্যাঙ্গনে প্রবেশ করলেন। এরপর প্রথম উপন্যাস দেয়ালের দেশ প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে। মাত্র ২৯ বছর বয়সে অর্জন করলেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, যা তাঁকে করে তোলে এ পুরস্কার পাওয়া সবচেয়ে তরুণ সাহিত্যিক।
বাবা সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন ছিলেন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। মা হালিমা খাতুন সংসার সামলালেও সন্তানদের শিক্ষায় ছিলেন অনুপ্রেরণার উৎস। ব্যক্তিজীবনে ছিলেন প্রথিতযশা লেখিকা ডা. আনোয়ারা সৈয়দ হকের জীবনসঙ্গী। তাঁদের এক ছেলে ও এক কন্যা রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে তিনি একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা অর্জন করেন।
বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব ঘরানায় তাঁর নির্ভীক পদচারণা তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
কাব্যে তিনি রচনা করেন পরাণের গহীন ভিতরসহ বহু স্মরণীয় গ্রন্থ।
নাটকে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় ও নূরলদীনের সারাজীবন তাঁকে যুগান্তকারী নাট্যকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
উপন্যাসে তিনি লিখেছেন এক মহিলার ছবি, দেয়ালের দেশসহ অসংখ্য রচনা।
প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা ও অনুবাদেও ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ উপস্থিতি।
তাঁর কলমে একদিকে ছিল মানুষের মুক্তির স্বপ্ন, দ্রোহের আগুন, অন্যদিকে মানবমনের সূক্ষ্ম আবেগ ও প্রেমের আবেদন।
সৈয়দ শামসুল হক জন্ম: ২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫ – মৃত্যু: ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নয় বছর পেরিয়ে আজও তাঁর মৃত্যু আমাদের জন্য এক গভীর শূন্যতা। তবে তাঁর সৃষ্টিকর্মে তিনি বেঁচে আছেন চিরস্থায়ী প্রেরণারূপে।
২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে আমরা দেখি, সৈয়দ শামসুল হকের সাহিত্যকর্ম নতুন প্রজন্মের কাছেও সমান প্রাসঙ্গিক। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভাণ্ডারে তাঁর অবদান কেবল ঐতিহাসিক নয়, সময় অতিক্রমকারীও বটে।
বাংলা সাহিত্য, নাট্যচর্চা কিংবা পাঠকসমাজ—সবখানেই আজও অমোচনীয় তাঁর প্রভাব। সত্যিই, সব্যসাচী এই লেখক চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আজও আমাদের আত্মা ছুঁয়ে যায়, আমাদের বিবেককে জাগ্রত করে।

Views: 0

বিভাগ: জীবনী, প্রবন্ধ/নিবন্ধ

লেখক সম্পর্কে

ISBN: