রংপুরের এক দীপ্ত মানুষ প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম
| | ০ মন্তব্য

সাকিল মাসুদ

রংপুরের সাহিত্য-সংস্কৃতির ভুবনে এক দীপ্ত নাম প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম। তিনি কেবল একজন লেখক নন, বরং একজন বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক কর্মী— যিনি একই সঙ্গে শিক্ষক, সাহিত্যিক, আবৃত্তিকার, বেতার ব্যক্তিত্ব ও একজন অভিভাবকতুল্য সংগঠক। সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের রয়েছে তাঁর চিহ্নিত পদচিহ্ন।

১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৬ জুলাই রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলার অন্নদানগর ইউনিয়নের বামনসরদার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ শাহ আলম। পিতা মোঃ আছিম উদ্দিন ও মাতা ফছিমন নেছা—এই দুই সাধারণ অথচ আদর্শবান মানুষের সন্তান হিসেবে তাঁর বেড়ে ওঠা। প্রাথমিক শিক্ষার শুরু পঞ্চানন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে অন্নদানগর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং কারমাইকেল কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি লেখালেখিতে সম্পৃক্ত হন। তাঁর লেখার ভেতর রয়েছে সমাজ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং মানবিকতার স্পষ্ট প্রতিফলন। গল্প, কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, লিমেরিক, বেতার নাটক ও গান—সব শাখাতেই রয়েছে তাঁর অবাধ বিচরণ। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘বৈরী বাতাসে স্বপ্নেরা’ পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। কাব্যগ্রন্থ ‘ধবল আলোর মায়াবী ডাক’, যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘সাহসী নিসর্গ’ ও যৌথ ছড়াগ্রন্থ ‘ছড়ায় স্বদেশ ছড়ায় জীবন’–এ তাঁর কাব্যিক স্বর আরও দৃঢ় হয়ে উঠেছে। গবেষণামূলক কাজেও তিনি অনন্য, বিশেষ করে ‘ভাওয়াইয়ায় প্রেম ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ এবং ‘ভাওয়াইয়া’ (যৌথ) গ্রন্থে তিনি এদেশীয় লোকগীতির সৌন্দর্য ও প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরেছেন। ”স্বাধীনতা পরবর্তী রংপুরে নাট্যচর্চা” তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।

তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে সাপ্তাহিক মহাকাল এবং দৈনিক দাবানল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য, রংপুরের স্বরশৈলী আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক, সাহিত্য-সংস্কৃতি সামাজিক সংগঠন “ফিরেদেখা”, রংপুর সাহিত্য পরিষদের উপদেষ্টা, কারমাইকেল কলেজের বিতর্ক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষক, ‘কানাসাস’-এর প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক উপদেষ্টা এবং রক্তদান সংগঠন ‘বাঁধন’ এর উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন।

শুধু শিক্ষা বা সাহিত্যেই নয়, সামাজিক সংগঠন ও সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমেও তিনি অগ্রণী। স্বরশৈলী তাঁর প্রতিষ্ঠিত আবৃত্তি চর্চাকেন্দ্র, যা আজ রংপুরে আবৃত্তিচর্চার অন্যতম অগ্রদূত। সাহিত্য-সংস্কৃতি-সামাজিক সংগঠন ফিরেদেখা-এর সম্মানিত উপদেষ্টা হিসেবেও তিনি সম্পৃক্ত। তিনি নিয়মিত বেতার, টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন, বিচারক হিসেবে উপস্থিত হন বিভিন্ন বিতর্ক ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতায়।

তাঁর সাহিত্যকর্ম ও সাংস্কৃতিক অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পদক ও সম্মাননা। এর মধ্যে রয়েছে—রংপুর নাগরিক পদক (১৯৯৫), বাংলাদেশ কবিতা পরিষদ পাবনার সাহিত্য পদক (১৪০৮), সোনার তরী সাহিত্য পদক, ঈশ্বরদীর অরুণিমা সাহিত্য পদক, আইডিয়া প্রকাশনের সেরা পাণ্ডুলিপি পদক (২০১৭) ইত্যাদি।

আইডিয়া প্রকাশন থেকে প্রকাশিত তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণাগ্রন্থ “স্বাধীনতা পরবর্তী রংপুরের নাট্যচর্চা” এবং “ভাওয়াইয়ায় প্রেম ও অন্যান্য প্রসঙ্গ” রংপুর অঞ্চলের নাট্য ও লোকসংগীতচর্চার গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি, বাংলাদেশের নীতিকবিতা বিষয়ে তাঁর আরেকটি বই প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে, যা সাহিত্যের ধারায় নতুন সংযোজন হতে চলেছে।

শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। একসময় রংপুরের ঐতিহ্যবাহী কারমাইকেল কলেজে অধ্যাপনা করতেন এবং পরবর্তীতে রংপুর সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব, ভাষা, এবং চিন্তাধারা তাঁকে একজন শ্রদ্ধেয় মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে।

প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম সাহিত্য-সংস্কৃতির যে বাগান চাষ করেছেন, তাতে ফুটে উঠেছে অগণিত সুবাসিত ফুল। তাঁর সৃজনশীল পথচলা অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা। পথ দেখায়, সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ করে। রংপুর তথা উত্তরাঞ্চলের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে তাঁর অবদান অমলিন ও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তাঁর জন্মদিনে অফুরন্ত শুভেচ্ছা।

Views: 0

বিভাগ: জীবনী

লেখক সম্পর্কে

ISBN: