উত্তরবঙ্গের শেকড় নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ক্রমশ ডুবে যাচ্ছি নিজের পারিবারিক ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গভীরে। ইতিহাস শুধু রাষ্ট্র, যুদ্ধ কিংবা বীরত্বগাঁথার বৃত্তান্ত নয়; এটি ব্যক্তি, পরিবার এবং একটি ভূখণ্ডের জীবন্ত সংস্কৃতিরও দলিল। আমার পূর্বপুরুষেরা রংপুর অঞ্চলের ভূমিপুত্র— তাঁদের পরিচয়, ধর্মীয় অনুশীলন, সামাজিক রীতিনীতি ও নামের বিন্যাস সবকিছুই যেন উত্তরবঙ্গের একটি বিস্তৃত সাংস্কৃতিক মানচিত্রের অংশ।
আমাদের পারিবারিক নামের ইতিহাসে একসময় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ ছিল— “সেখ”। এই শব্দটি কোনো এক সময় উত্তরবঙ্গের প্রায় সকল মুসলমানের নামের অংশ ছিল। আমার পরিবারেও চার পুরুষ আগে পর্যন্ত প্রত্যেকের নামের সঙ্গে “সেখ” যুক্ত থাকত। আজ তা অনুপস্থিত— হারিয়ে গেছে পরিচয়পত্র থেকে, স্মৃতি থেকে, এমনকি উচ্চারণ থেকেও। কেন বা কীভাবে এই পরিবর্তন, তার অনুসন্ধানে গিয়ে আবিষ্কার হলো একটি বিস্মৃতপ্রায় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বাঁক।
প্রখ্যাত ভাওয়াইয়া শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ তাঁর আত্মজীবনী “আমার শিল্পী জীবন”-এ উল্লেখ করেছেন, তাঁর পূর্বপুরুষেরা কোচবিহার অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন। তখনকার দিনে কোচবিহার, দিনহাটা ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোর মুসলমানেরা তাঁদের নামের সঙ্গে “সেখ” ব্যবহার করতেন। বাবার সাথে আদালতের জনসমাবেশে আসা কিশোর আব্বাসউদ্দীন বহু “সেখ” নামধারী ব্যক্তিসহ একসাথে ঘোষণা করেন, তাঁরা আর “সেখ” শব্দের ব্যবহার করবেন না। তারা একটি হলফনামাও প্রকাশ করেন। কারণ হিসেবে তাঁরা উল্লেখ করেন, “সেখ” শব্দটি শিয়া মুসলমানদের পরিচায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, অথচ তারা সুন্নি মুসলমান। এই ধর্মীয় বিভাজন থেকে নিজেদের আলাদা করতেই তাঁদের এমন সিদ্ধান্ত।
আমার পরিবারের দিকেও তাকালে দেখি, দাদার পূর্বপুরুষদের নাম ছিল “মোহাম্মদ সেখ” তার বাবা পন্তু সেখ, দাদির দিকের পূর্বপুরুষের নাম “হাবিল সেখ”/”কাবিল সেখ”— এমনকি আঠাশতকের ভূমি জরিপ অর্থাত ১৯৪০ এর দলিলপত্রেও এই অঞ্চলের মানুষের নামের সাথে এ উপসর্গ আছে। অথচ আমার বাবা বা তাঁর ভাইদের নামের সঙ্গে “সেখ” আর নেই। বর্তমান রংপুর অঞ্চলে সেখ শব্দ নেই বললেই চলে। এই একটি শব্দের অন্তর্ধান, একটি সংস্কৃতির নিরব বিপর্যয়ের সাক্ষ্য যেন।
আমি নিজে বেড়ে উঠেছি এক ধর্মনিষ্ঠ সুন্নি মুসলিম পরিবারের রীতিতে, যেখানে মিলাদ মাহফিল, শবে বরাতের উৎসব, রুটি-হালুয়া রান্না ও মৌলভী-নেতৃত্বাধীন দোয়া অনুষ্ঠান ছিল জীবনের অংশ। এখনও পরিবারের ভালো কোনো কাজ শুরু করার আগে মিলাদ পড়ানো হয়। শবে বরাতের রাতে আমাদের বাড়িতে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো।
সকালে ৭–৮ জন মহিলা রান্নার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে যেতেন— চালের আটা দিয়ে গোল রুটি, নানা ধরনের হালুয়া, গরুর মাংস ও তরকারি বানাতেন। বাদ আসরের পর মৌলভী সাহেব আসতেন, সঙ্গে থাকতেন মসজিদের জামাতের মুসল্লিরা। মিলাদ পড়া হতো, দরুদ ও কবিতা আবৃত্তি হতো। যদিও কবিতা পাঠ সম্পর্কে মুসলমানেরা ছিল অজ্ঞাত। মিলাদের পর বিতরণ করা হতো শত শত হালুয়া-রুটি ও খোরমা। শিশু-কিশোরদের কাছে এটি ছিল এক ধর্মীয় উৎসবের দিন।
এই মিলাদে একটি দরুদমূলক কবিতা প্রায়ই সুর করে পড়া হতো, এবং হয়। যেটি আজও কানে বাজে—
> “বালাগাল উলা বি কামালিহি
কাশাফাদ্দুজা বি জামালিহি
হাসুনাত জামিউ খিসালিহি
সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি।”
যার বাংলা ভাবানুবাদ:
> সাধনায় যিনি পৌঁছেছেন পূর্ণতার শিখরে,
সৌন্দর্যের জ্যোতিতে যিনি মুছে দিয়েছেন আঁধার,
যাঁর চরিত্রে মিলেছে সকল গুণের সমাহার,
এসো, তাঁর ও তাঁর বংশধরদের প্রতি পাঠাই দরুদ ও সালাম।
ছেলেবেলায় আমরা জানতাম না, এটি ছিল মূলত পারস্যের কবি সেখ সাদীর লেখা কবিতা। বরং এটি ছিল আমাদের কাছে মিলাদের একটি ধর্মীয় কেরাতের অংশ। কিন্তু এখন বুঝি, কাব্য, ধর্ম ও সংস্কৃতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ এই কবিতাটিতে রয়ে গেছে যুগযুগ। —ধর্মীয় অনুভূতির সুরে।
আজ, যখন বিশ্বজুড়ে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের খবরে মন ভারাক্রান্ত, তখনই এসব ক্ষুদ্র সাংস্কৃতিক স্মৃতি, ধর্মীয় রীতি, নামের ঐতিহ্য— সবই আমাকে টেনে নিয়ে যায় আত্মপরিচয়ের মূল শিকড়ে।
প্রশ্ন জাগে— “একজন ইরানী কবি সেখ সাদী কীভাবে উত্তরবঙ্গের মুসলমান মিলাদে এমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন? কবে থেকে এবং কীভাবে এই ভূমির সাথে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধ তৈরি হলো তাঁর?”
Views: 0