বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেওয়ার পর থেকে একটি মৌলিক প্রশ্ন— রাষ্ট্র তার নাগরিককে মতপ্রকাশের কতখানি অধিকার দিয়েছে?
স্বাধীনতার অর্থ যদি শুধু ভূখণ্ডের ওপর রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা হয়, তাহলে এই প্রশ্ন আর কার্যকর থাকে না! তবে একথাও তো সত্য, বাস্তবিক অর্থেই তখন স্বাধীনতা কার্যকর থাকে না।
যে দেশে মানুষের মুখের ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবি শেষ অবধি ঠেকেছিল মতপ্রকাশের অধিকারে, আর সেই অধিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল একটা সশস্ত্র জনযুদ্ধ। মতপ্রকাশের অধিকার যতই ক্ষুণ্ণ করেছিলেন তৎকালীন শোষকেরা, ততই অনিবার্য ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম।
বাংলাদেশের মানুষ সেই জনযুদ্ধ করেই বিজয় আনলেন, স্বাধীন হলেন।
অবশ্য রাষ্ট্রের প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার নাগরিক রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠের বিশ্বাস—সবকিছুকেই প্রশ্ন করার নৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার রাখে।
বাংলাদেশ কি সেই সক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছে?
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যাবে, এ রাষ্ট্র সমালোচনা সহ্য করতে শেখে না। ফলে সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক ভাষা বদলেছে, মতাদর্শ বদলেছে— কিন্তু ভিন্নমতকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা থেকে আমরা মুক্ত হতে পারিনি। এবং এই চরিত্র রাষ্ট্র থেকে ইজমজীবী নাগরিক সবার ভেতর সমানভাবে বিদ্যমান।
এই ব্যর্থতার ইতিহাসের দৃষ্টান্ত শুরু হয় শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে। সম্ভবত ১৯৭৩ সালে কবি দাউদ হায়দারকে কবিতা লেখার অপরাধে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল; পরবর্তীতে তিনি জার্মানিতে আশ্রয় নিয়ে জীবন কাটান। কবিতা লেখাকে রাষ্ট্র যখন অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। একজন কবিকে তার ভাষা, সংস্কৃতি ও জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তখন কেবল ব্যক্তির ওপর নিপীড়ন নয়— বরং রাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাধীনতার ধারণার মৌলিক বিরোধও শুরু হয়। কারণ রাষ্ট্র যদি বলে— ‘তুমি স্বাধীন, কিন্তু তুমি কী বলতে পারবে তা আমি নির্ধারণ করব!’, তবে সেই স্বাধীনতার ভেতরেই মৌলিক পরাধীনতা আশ্রিত।
পরবর্তী সময়ে তসলিমা নাসরিনের ঘটনা আমাদের সেই প্রশ্নের সামনে আবার দাঁড় করিয়েছে। তিনি একজন কবি। একজন লেখক ও একজন সমাজচিন্তক। এছাড়াও তিনি একজন নারী। অর্থাৎ সর্বোচ্চ সহনশীলতাই তার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য।
তাই বলে তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়াটা জরুরি নয়। বরং গণতান্ত্রিক কিংবা সভ্য সমাজে তার বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করার অধিকারও অন্য যে কোনো মানুষের আছে। কিন্তু এখানেই একটি সভ্য সমাজের মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয়— বিরোধিতা এবং বিনাশ এক জিনিস নয়।
একজন মানুষকে ভুল প্রমাণ করার জন্য যুক্তি প্রয়োজন; তাকে হত্যা করার জন্য যুক্তির প্রয়োজন হয় না।
যে সমাজে যুক্তি যেখানে পরাজিত হয়, সেখানে প্রায়ই সহিংসতা তার বিকল্প হয়ে ওঠে। সে সমাজে লিখিত প্রশ্নের উত্তর, লিখে দেওয়ার পরিবর্তে প্রশ্নকারীকে নিশ্চিহ্ন করার আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়, সেখানে সমস্যা কেবল কোনো ব্যক্তির বক্তব্যে নয়; সমস্যা সমাজের জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোতে।
অর্থাৎ তখন আর প্রশ্ন করা যায় না— ‘সে যা বলছে তা সত্য কিনা?’
প্রশ্ন দাঁড়ায়— ‘সে কেন বলার সাহস পেল?’
এই পরিণতি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
তখন বক্তব্য আর আলোচনার বিষয় থাকে না; বক্তাই হয়ে ওঠে অপরাধের বস্তু।
তখন কোনো ধারণাকে খণ্ডন করার পরিবর্তে মবজাস্টিসের মাধ্যমে ধারণার বাহককে শাস্তি দেওয়া হয়। বইয়ের বিরুদ্ধে বই লেখা হয় না; লেখকের বিরুদ্ধে ফতোয়া ঘোষণা করা হয়। যুক্তির বিরুদ্ধে যুক্তি দাঁড়ায় না; ঢাল হয়ে দাঁড়ায় ফতোয়ান্ধ ক্রোধ। এবং শেষ পর্যন্ত সেই ক্রোধ কখনো কখনো হত্যাকে নৈতিক বৈধতাও দেওয়ার চেষ্টা করে।
বিশ্বাস ব্যক্তিগত হতে পারে, কিন্তু বিশ্বাসের সামাজিক প্রকাশ রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে। একজন মানুষ তার ধর্মবিশ্বাস নিয়ে যত গভীরভাবে বাঁচতে পারেন, অন্য একজন মানুষ তত গভীরভাবে সেই বিশ্বাসের কোনো ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্নও তুলতে পারেন। এই দুই অধিকারকে একই সঙ্গে ধারণ করাই হলো বহুত্ববাদী সমাজের ভিত্তি।
মজার ব্যাপার হলো, দীর্ঘ সময়ে তসলিমার বিরোধীদের যাদের জিজ্ঞেস করেছি, তারা নিরানব্বই ভাগই তসলিমার কোনো বই পড়েনি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, স্বাধীনতা ও শান্তিপ্রিয় মানুষের প্রকৃত পরীক্ষা— আমার পছন্দের মতকে রক্ষা করা নয়।
বরং আমি যে মতকে অপছন্দ করি, যে বক্তব্যে আহত হই, এমনকি যে ধারণাকে বিপজ্জনক মনে করি— তারও বক্তব্য রাখার অধিকার আমি কতটা স্বীকার করি, সেটিই স্বাধীনতা ও শান্তিশাস্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা।
কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাস যখন নৈতিক আত্মশুদ্ধির পরিবর্তে ভিন্ন পরিচয়ে-রাজনীতির অস্ত্র হয়ে ওঠে, যখন ‘আমি বিশ্বাস করি’ ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয় ‘তোমাকেও আমার মতো বিশ্বাস করতেই হবেতে।’, তখন রাষ্ট্র নাগরিকের থাকে না, হয়ে ওঠে সংখ্যাগরিষ্ঠের আগ্রাসন।
তারপর— ‘তুমি আমার বিশ্বাসকে প্রশ্ন করেছ, অতএব তুমি শত্রু।’
আর শত্রুকে যুক্তি দিয়ে পরাজিত করার চেয়ে ধ্বংস করে দেওয়া বিধানসম্মত।
রংপুরের সেই লাইব্রেরিয়ান জুয়েলকে পুড়িয়ে মারার পৈশাচিক ঘটনার ভিডিও দেখেছি— একজন মানুষ আগুনে পুড়ছে, মৃত্যুর জন্য ছটফট করছে, আর তার চারপাশের কিছু মানুষ যেন সেই দৃশ্যের মধ্যে এক ধরনের উন্মাদ বিজয় অনুভব করছে। যে মুহূর্তে একজন মানুষের মৃত্যু অন্য মানুষের কাছে পবিত্র সাফল্য হয়ে ওঠে, সেই মুহূর্তে হত্যাকারী শুধু একজন মানুষকে হত্যা করে না; সে সমাজের তথা রাষ্ট্রের মানবিকতার মৌলিক ধারণাকেও হত্যা করে।
কারণ সভ্যতার সবচেয়ে পুরোনো নৈতিক শিক্ষা হলো— মানুষকে হত্যা করা যত সহজ; মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা তার চেয়ে অধিক কঠিন।
ধর্মের নামেও যদি সেই কঠিন কাজটি মানুষ ভুলে যায়, তাহলে ধর্মের বাহ্যিক চিহ্ন যতই বৃদ্ধি পাক, মানুষের ভেতরের নৈতিকতা ততই ক্ষীণ হতে থাকবে।
তাই প্রশ্ন, তসলিমা নাসরিন ধর্মবিরোধী কিনা— এখানে এসে শেষ হয় না। প্রশ্নটি আরও গভীরতার দিকে টানে। তসলিমা নাসরিন নিজেও বলেছেন তিনি মানুষের দর্মবিশ্বাসের বিরোধী নন। তবে তিনি তার মনে তৈরি হওয়া প্রশ্নটি দিধাহীনভাবে করতে চান।
এখানেই শুরু হয় জটিলতা।
একজন মানুষ লেখার ভাব প্রকাশের ভেতর দিয়ে কি প্রশ্ন করতে পারবে?
একজন মানুষ লেখার ভাব প্রকাশের ভেতর দিয়ে কি এমন কথা বলতে পারবে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে অস্বস্তিকর?
আর সে লেখায় বা চিন্তায় কোনো বক্তব্য যদি সত্যিই ক্ষতিকর হয়, তার মোকাবিলার পদ্ধতি কি হত্যা— নাকি যুক্তি, সমালোচনা, সামাজিক প্রতিরোধ এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ?
রাষ্ট্রের আসল কাজ, স্বাধীনতার আস্বাদন এখানেই।
রাষ্ট্র কোনো বিশ্বাস কিংবা গোষ্ঠীর পাহারাদার নয়; রাষ্ট্র নাগরিকের অধিকারের রক্ষক। রাষ্ট্রের কাজ কোনো মতকে সত্য ঘোষণা করা নয়; রাষ্ট্রের কাজ হলো বিভিন্ন মতের মানুষের সহাবস্থানের ন্যূনতম নৈতিক ও আইনি কাঠামো নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র যদি ধর্ম, বর্ণ, রাজনৈতিক ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগের কাছে সংখ্যালঘু মতের স্বাধীনতা সমর্পণ করে, তাহলে গণতন্ত্র সংখ্যার শাসনে পরিণত হয়। আর সংখ্যার শাসন সবসময় গণতন্ত্র নয়।
কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের কথা বলার জন্য রাষ্ট্রের বিশেষ সুরক্ষার প্রয়োজন হয় না। প্রকৃত সুরক্ষার প্রয়োজন হয় ভিন্নমতের মানুষের সুরক্ষায়।
তসলিমা নাসরিন অথবা আজ সারাদেশে সৃষ্ট মাজার কাণ্ড, বাউল নির্যাতন, নুরা পাগলার ঘটনা। কাল হয়তো অন্য কেউ। পরশু হয়তো এমন একজন, যিনি হয়ত আজকের তসলিমা নাসরিনের বিরোধী ছিলেন, পক্ষে ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠদের।
এই কারণেই কোনো লেখকের সঙ্গে কারো মতের মিল থাকা জরুরি নয় তার লেখার অধিকারকে স্বীকার করার জন্য।
তার বক্তব্য পছন্দ করা জরুরি নয় তাকে মানুষ হিসেবে স্বীকার করার জন্য।
যুক্তি গ্রহণ করা জরুরি নয় তাকে যুক্তি দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য।
মনে রাখা জরুরি, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা একবার অর্জিত হয়; কিন্তু মানুষের স্বাধীনতা প্রতিদিন রক্ষা করতে হয়।
আর সেই স্বাধীনতার প্রথম শর্ত—
মানুষকে কথা বলতে দিতে হবে।
আজ কবি তসলিমা নাসরিনের জন্মদিন। তার জন্য শুভকামনা।











পাঠক মন্তব্য ও পর্যালোচনা২টি
আপনার মূল্যবান মতামত বা রিভিউ দিন
অতিথি হিসেবে মন্তব্যমর্যাদা রক্ষার দাবি শেষ অবধি ঠেকেছিল মতপ্রকাশের অধিকারে, আর সেই অধিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল একটা সশস্ত্র জনযুদ্ধ। মতপ্রকাশের অধিকার যতই ক্ষুণ্ণ করেছিলেন তৎকালীন শোষকেরা, ততই অনিবার্য ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম। বাংলাদেশের মানুষ সেই জনযুদ্ধ করেই বিজয় আনলেন,
বেশ। তথ্য ও তত্বে সমৃদ্ধ।