চীনের লেগেছিল ২০ বছর, আমাদের হবে কবে!
পৃথিবীতে মানুষ বাঁচতে শিখে আশায়।
কেউ না কেউ মানুষকে স্বপ্ন দেখায়। স্বপ্নের বীজ বুনে দেয় কেউ। যেমন রাশিয়ায় স্ট্যালিন, ভিয়েতনামে হো চো মিন, সিঙ্গাপুরে লি কুয়ান ইউ, দক্ষিণ কোরিয়ায় পার্ক চুং হি যারা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে রাষ্ট্রের উন্নতি করেছিল।
উচ্চতা মাত্র ৪ফুট ১১ ইঞ্চি। হ্যাঁ ছোট উচ্চতার একজন মানুষ চীনকে ৮০ কোটি দরিদ্র মানুষের দেশ থেকে টেনে তুলেছিলেন। যার কারণে আপনি চীনকে আজ এত অগ্রগতি হিসেবে দেখেন। পাশ্চাত্য সভ্যতা আজকে যে চীনকে সমীহ করে চলে তার কারণ দেং শিয়াওপিং। সময়টা খুব বেশিদিনের নয়। মাত্র দুই দশক। তিনি চীনের কোনো প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি ছিলেন একটু ভিন্ন। ভিন্ন ধাঁচের মানুষ। বলতে পারেন ঘাড় ত্যাড়া, কাজকর্মে বাঁকা মানুষ। যিনি আধুনিক চীনের রূপকার হিসেবে বললেও ভুল হবে না।
১৯৪৯ সালে চীনে মাও সেতুং এর নেতৃত্বে চীন বিপ্লব হয়। কিন্তু বিপ্লব পরবর্তী চীনের সামগ্রিক ব্যবস্থা এক ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে পড়ে। চীনের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও আমূল পরিবর্তনে মাও সেতুং প্রথমেই হাত দেন জমি সংস্কারে। এক ঘোষণায় সমস্ত জমি নিয়ন্ত্রণ নেয় সরকার। মালিকানা পরিবর্তন হয়ে সরকার নিয়ন্ত্রিত জমিতে চালু হয় সমবায় ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা। মানে রাষ্ট্র উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করবে, তারপর ফসল সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হবে। কিছু সংরক্ষিত থাকবে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে কোষাগারে। বিষয়টি অনেক সরল, সহজ মনে হলেও মানুষ কিন্তু জটিল। মানে মানুষের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পদের প্রবণতা প্রাগৈতিহাসিক কাল ধরে লালনপালন করে আসছে। পরিবার, পরিজন, সন্তান সন্তানাদি আছে তাই বলে ব্যক্তিগত সম্পদ থাকবে না৷ এ তাড়নায় তখন চীনে দেখা দেয় আরেক সংকট। অনেক মানুষ পরিশ্রম না করেও ফসলের ভাগ পায়। কাজে ফাঁকি দেওয়া শুরু করে অনেকে। সমবায় সংস্থাগুলো সরকারকে অধিক উৎপাদনের তথ্য দিলেও প্রকৃতপক্ষে তা অনেকাংশেই কম ছিল। কালক্রমে বছর কয়েকের মধ্যে উদ্ভব পরিস্থিতিতে চীনে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। চীন তখনও কৃষি নির্ভর দেশ। চড়াই উৎরাই চলছে চীনের মানুষের জীবনে৷ স্বপ্ন উন্নত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার।
মাও সেতুং ভাবলেন দেশে প্রতিবিপ্লবীরা তাইওয়ান থেকে ঢুকে পড়েছে জনগণের মধ্যে। ফলে ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে চালিত সাংস্কৃতিক আন্দোলন বা বিপ্লব দেশের বুর্জোয়া, পুঁজিপতি, পেটি-বুর্জোয়াদের উৎখাতে নিজ দল ও দেশের ভেতর এক সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন আরম্ভ করলেন। গঠিত হয় রেড গার্ড বাহিনী। ইতিমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়। এ আন্দোলনে নিহত হয় অনেক মানুষ। অবশেষে সামাজিক রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন অপূর্ব রেখেই মাও সেতুং ১৯৭৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। দেং শিয়াওপিং তখন চীনের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম প্রভাবশালী নেতাদের একজন। তিনি শুধু কৃষকদের নিয়ে পড়ে রইলেন না, ভাবলেন সবাইকে নিয়ে। তিনিই সর্বপ্রথম চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারে ১৯৭৮ সালে চীনের প্রচলিত গোঁড়া কমিউনিস্ট অর্থনীতিতে পরিবর্তনে হাত দিলেন। যেখানে চালু করেন মুক্তবাজার অর্থনীতি। কিন্তু বিপদে পড়লেন চীনের সংস্কার বিরোধী নেতাদের। তারা বলতে শুরু করলেন আমরা যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিপ্লব করেছি তা আবার ফেরত আসবে। কাজেই এসব বন্ধ করা উচিত। সংস্কারের নামে পুরনো বন্দোবস্ত, পুঁজিবাদ ব্যবস্থার। দেও শিয়াং পিও দমলেন না। গোঁড়াপন্থী নেতাদের বুঝাতে চেষ্টা করলেন। সমাজ পরিবর্তনশীল ফলে সমাজতন্ত্রের কাঠামোও কোনো স্থির কাঠামো নয়। তাও এই জনঘনত্ব চীনের জনগণের বৃহত্তর কল্যাণের জন্য পরিবর্তন করা দরকার। শুধু কৃষি দিয়ে জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত সম্ভব নয়। দার্শনিক বাগসঁ লিখেছিলেন :" মানুষ কেবলই যন্ত্র, মন্ত্র নয়। তার রয়েছে সৃজনশীলতা। এর জন্যই মানুষের প্রয়োজন হয় স্বাধীনতার।" বস্তুবাদের নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র-মন্ত্র মানুষকে করতে পারে বিকলাঙ্গ।
দুই-তিন দশক চীন ছিল পৃথিবী থেকে বাইরে। প্রবল বিরোধিতার মুখেও দে শিয়াও পিং কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের বাস্তবিক অবস্থা বুঝিয়ে শুধুমাত্র পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য চীনকে খুলে দেন। এ চীন খোলা সর্বত্র ছিল না। সমুদ্র সীমানা ঘেঁষা দক্ষিণ চীন সাগর তীরবর্তী অঞ্চলে বিদেশি লগ্নি পুঁজি প্রবেশের বাঁধা মুক্ত করে উন্মুক্ত করে দিলেন কিন্তু তাই বলে অবমুক্ত নয়, নিয়ন্ত্রণ থাকলো সরকারের। ব্যক্তিগত পর্যায়ে উৎপাদন, লাভ-লোকসানের কথাও তার চিন্তা ছিল। ফলে দেশের ভেতরে গঠন করলেন 'ডগ ওয়াচ' কমিটি। কর্মঠ
মানুষের জন্য সরকারিভাবে সহজশর্তে ঋণের ব্যবস্থা করলেন। দুর্নীতি বন্ধে নিলেন কঠোর পদক্ষেপ। বিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগ সহজ করার জন্য প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক কাঠামোকে বাতিল করে চালু করলেন 'ওয়ান স্টপ সার্ভিস পলিসি'। মানে বিনিয়োগ করতে কোনো বিদেশি কোম্পানিকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন দরজায় ঘুরতে হবে না। পড়তে হবে না লাল ফিতার দৌরাত্মে। আসুন, বসুন এক জায়গায় সব কাগজপত্র জমা দিয়ে যাচাই-বাছাই করে অনুমতিপত্র নিয়ে আগামীকালের মধ্যেই কাজ শুরু করুন। সাথে কর কমিয়ে দিলেন বিদেশি বিনিয়োগকারী কোম্পানির ওপর।
তিনি বিরোধিতাকারীদের তোপের জবাবে বলছিলেন : " আমরা বাজার উন্মুক্ত করবো এর মানে এই নয় যে, আমাদের বাড়ি-ঘর জমি সব ওদের। আমরা জানাল খুলে দিবো। আমরা বিশুদ্ধ বাতাস নিবো কিন্তু ময়লা আটকিয়ে দিবো।" তিনি প্রতীকী অর্থে বিদেশি বিনিয়োগকারী কোম্পানির উদ্দেশে আরও বলেছিলেন- " বিড়াল সাদা হোক বা কালো, তাতে সমস্যা নাই। আমাদের দেখা উচিত বিড়াল ইঁদুর মারতে পারে কি-না।"
তাতে দেখা গেল কয়েক বছরের মধ্যেই আশেপাশের দেশে থাকা বিদেশি কোম্পানিগুলো চীনে বিনিয়োগ বাড়াতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে এক দশকের মধ্যেই গড়ে ওঠল চীনের সমুদ্র, বন্দর ও বাণিজ্যিক নগরগুলো। অবকাঠামোখাত উন্নত হলো। গড়ে ওঠল ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ক্ষুদ্র শিল্প-কারখানা। কিন্তু গ্রাম থেকে যেন বেকারত্বের শিকার হয়ে তরুণ-তরুণীরা শহরে এসে ভিড় না করে, সে ব্যবস্থাও করলেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোল হলো জেলা,উপজেলা শহরগুলোতে। প্রান্ত থেকে শহর জুড়ে চলল এক কর্মযজ্ঞ। বন্ধ হয়ে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ পুনরায় চালু করা হলো৷ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দেশীয় শিক্ষার্থীদের পাঠানো হলো পাশ্চাত্যে। তারা যেন ফিরে আসতে পারে সে সম্মানের ব্যবস্থাও করলেন দেও শিয়াও পিং। বাড়লো শিক্ষা ও গবেষণায় সর্বোচ্চ বিনিয়োগ। ধীরে ধীরে ১৯৮০-২০০০ সালের মধ্যেই চীনের অর্থনীতি, গবেষণা, প্রযুক্তি এতটাই বিকশিত হতে শুরু করলো যে আজকের বর্তমান চীনের অবস্থান আপনি নিজেই দেখতে পাচ্ছেন। একে বলা হয় "সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি" বা "চীনের বৈশিষ্ট্যযুক্ত সমাজতন্ত্র"। বাংলাদেশে অনেকে ভ্রু-কুচকে বলেন রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের "চৈনিক সমাজতান্ত্রিক মডেল"।
১৯৯৭ সালে দেও শিয়াংপিও মৃত্যু বরণ করলেন কিন্তু তিনি যে চীনা অর্থনৈতিক সংস্কারে ভূমিকা রেখেছিলেন তাকে আজও চীনের মানুষ স্মরণ করে। কেউ কেউ বলেন শি জিনপিং সেই পথেরই একজন।
বাংলাদেশে ৮০'র দশকে আমাদেরও শুরু হয়েছিল। কিন্তু হয়নি। কেন হয়নি? এর অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা হয়তো অনেক। বিরোধিতাও আকাশচুম্বী। কিন্তু জনগণের অবস্থা তো পাল্টায় নি। পাল্টিয়ে মাত্র কর্তৃপক্ষ। বদল হয়েছে পুরনো নাটবল্টুর বদলে নতুন মেশিনের। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এদেশটাকে সব মানুষ তাদের ভূমিপুত্র হিসেবে এখনো ভাবতে পারে নি। ৭১'র পর আর ঐক্যবদ্ধ করা যায়নি বাংলাদেশীদের। ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা, অপচেষ্টায় সাধারণ মানুষ হয়ছে অধিকার বঞ্চিত। জামাল উদ্দিনের পোলা কলিমউদ্দিনের চেহারা একই রয়ে গিয়েছে। মাঝখানে পাচার হয়েছে টাকা। লুটেরা লুট করেছে। বিদেশ বিভূঁইয়ে বানিয়েছে প্রসাদ। হাড়ভাঙা খেটেছে করমালি, মোটা হয়েছে জব্বার। যে মেধাবী একবার দেশ ছেড়েছে, সে আর আসেনি। এবার যদি কেউ সত্যি সত্যি করতে পারেন শুরু।
লেখক
মনির হোসেন
প্রভাষক
বাংলা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর।











পাঠক মন্তব্য ও পর্যালোচনা০টি
আপনার মূল্যবান মতামত বা রিভিউ দিন
অতিথি হিসেবে মন্তব্য