বিনয় মজুমদার, একজন গণিতপ্রবণ প্রকৌশলী ও কবি। তাঁর জীবনটাও যেন গণিতের গল্পের মতোই—অদ্ভুত, যুক্তিনির্ভর অথচ হিসাবের বাইরে।
১৯৩৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, তৎকালীন বার্মা, বর্তমান মিয়ানমারের মিকটিলা জেলার টোডো শহরে জন্ম হয়েছিল ছয় ভাই-বোনের কনিষ্ঠ ‘মংটু’র। এই মংটুই বড় হয়ে গণিতপ্রেমী প্রকৌশলী হলেন, শিক্ষকতা করলেন, গবেষণাধর্মী কাজ করলেন, আর একসময় মনে হলো—তিনি কবি হবেন। হয়ে গেলেনও। তারপর হঠাৎ তাঁর মনে হলো, তিনি তাঁর পূর্বপুরুষের ভিটে, ফরিদপুরে যাবেন—পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই। দেশ তখন বদলে গেছে; পূর্ব বাংলা হয়ে গেছে পাকিস্তানের অংশ। সীমান্ত পেরিয়ে ইচ্ছেমতো যাওয়া-আসার আর সুযোগ নেই। কিন্তু বিনয় অনড়। জন্মভূমি, পূর্বপুরুষের ভূমি—সেখানে যেতে তাঁকে কে বাধা দেবে?
শেষ পর্যন্ত ১৯৬৬ সালে তিনি পায়ে হেঁটে বনগাঁ সীমান্ত পেরিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ফরিদপুরের পৈতৃক গ্রামে গিয়ে উপস্থিত হন। সেখানে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা করেন, কিছুদিন থাকেনও। পরে নিজেই স্থানীয় থানায় গিয়ে জানান যে তিনি ভারতীয় নাগরিক এবং বিনা পাসপোর্ট-ভিসায় পাকিস্তানে প্রবেশ করেছেন। তাঁকে ভারতে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি কলকাতায় ফিরে যান। ঘটনাটি তাঁর অদ্ভুত অথচ স্বতন্ত্র জীবনবোধেরই এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
লোকে বলেছিল, কবিরা তো এমনই হন! কবিদের জীবনে অনেক কিছুই হঠাৎ ঘটে।
আজ অসাধারণ প্রতিভাধর কবি বিনয় মজুমদারের ৯২তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধায়। ১৯৩৪ সালে জন্ম নেওয়া এই কবি ২০০৬ সালের ১১ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
পঞ্চাশের দশকের বাংলা কবিতার এক স্বতন্ত্র কণ্ঠ বিনয় মজুমদার। পেশায় তিনি ছিলেন প্রকৌশলী; গণিত ও বিজ্ঞানের প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। কিন্তু জীবনের শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রধান সাধনা ছিল কবিতা। তাঁর কাব্যভাষায় গণিত, জ্যামিতি, বিজ্ঞান, প্রকৃতি, প্রেম ও দর্শন এক আশ্চর্য সম্পর্কের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে। গণিতের কাঠামো তাঁর কবিতার ভাবনা ও আঙ্গিককে দিয়েছে এক ভিন্নতর আদল।
ফরিদপুরের বিপিনবিহারী মজুমদার ও বিনোদিনী দেবী অন্য অনেকের মতো ভাগ্যের অন্বেষণে বার্মায় পাড়ি দিয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে পরিবারটি ফিরে আসে পূর্ব বাংলার পৈতৃক ভিটে ফরিদপুরের বৌলতলী এলাকায়। শৈশবের একটি বড় সময় সেখানেই কাটে বিনয়ের। পরবর্তী সময়ে পরিবার চলে যায় পশ্চিমবঙ্গে।
ছোটবেলা থেকেই বিনয় ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। ১৯৪২ সালে বৌলতলীর তারাইল পাঠশালায় তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় বলে জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে কলকাতার মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করেন। ১৯৫১ সালে গণিত নিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। এরপর শিবপুরের বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ১৯৫৭ সালে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক হন।
ছাত্রজীবন থেকেই কবিতা লিখতেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নক্ষত্রের আলোয়’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৮ সালে। এরপর তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন—অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব হাইজিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, ত্রিপুরা গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টে তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্ব কাটে। একসময় চাকরি ও পেশাগত জীবনের নানা সম্ভাবনাকে পেছনে ফেলে তিনি কবিতাকেই জীবনের প্রধান অবলম্বন করে নেন।
তাঁকে বার্লিনে গণিত পড়ানোর জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলেও জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ আছে; কিন্তু বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে পরিবারের আপত্তির কারণে তিনি সে সুযোগ গ্রহণ করেননি।
১৯৬০ সালে প্রকাশিত ‘ফিরে এসো, চাকা’ তাঁকে বাংলা কবিতায় বিশেষভাবে পরিচিত করে তোলে। গ্রন্থটি গায়ত্রী চক্রবর্তীকে উৎসর্গ করা। প্রেম, প্রকৃতি, বিজ্ঞান, জ্যামিতি, সংখ্যা ও অস্তিত্বের নানা রহস্য তাঁর কবিতায় একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।
১৯৬২-৬৩ সালের দিকে তিনি হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। হাংরি বুলেটিনে তাঁর কয়েকটি কবিতাও প্রকাশিত হয়। তবে পরবর্তীতে আন্দোলনের কয়েকজন কবির সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে তিনি সেখান থেকে সরে আসেন।
বিনয় মজুমদারের কাব্যগ্রন্থের তালিকা দীর্ঘ। **‘নক্ষত্রের আলোয়’, ‘ফিরে এসো, চাকা’, ‘গায়ত্রীকে’, ‘অধিকন্তু’, ‘ঈশ্বরীর’, ‘বাল্মীকির কবিতা’, ‘আমাদের বাগানে’, ‘আমি এই সভায়’, ‘এক পঙক্তির কবিতা’, ‘আমাকেও মনে রেখো’, ‘কবিতা বুঝিনি আমি’, ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’**সহ তাঁর বহু কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতায় স্বতন্ত্র স্থান করে নিয়েছে।
তাঁর কবিতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—গণিতের বিমূর্ত জগতকে তিনি কবিতার অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন। ক্যালকুলাস, স্থানাঙ্ক জ্যামিতি, সংখ্যা, ঘনমূল—এসব গাণিতিক অনুষঙ্গ তাঁর কবিতায় কখনো প্রতীক, কখনো উপমা, কখনো চিন্তার কাঠামো হয়ে এসেছে। ‘আমি গণিতের শূন্য’-এর মতো কবিতার নামই তাঁর এই স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় বহন করে। গণিতের দুর্বোধ্যতার মিথ এবং কবিতার আবেগ—দুই বিপরীত মেরুর বিষয়কে তিনি পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছেন। এটাই তাঁর কবিতার অন্যতম স্বাতন্ত্র্য।
তিনি লিখেছেন ‘ফিরে এসো, চাকা’। চাকা মানবসভ্যতার এক মৌলিক প্রতীক। মানুষ তার প্রয়োজন থেকেই আবিষ্কার করেছে চাকা, ভেলা, নৌকা; পাখিকে দেখে আকাশে উড়তে চেয়েছে। সেই চাকা, সেই প্রকৃতি, সেই মানব-আবিষ্কারের বিস্ময়—সবই বিনয়ের কবিতায় এসে প্রেম ও অস্তিত্বের গভীর অর্থ বহন করেছে। তাঁর কবিতা তাই শুধু প্রেমের কবিতা নয়; তার মধ্যে রয়েছে প্রকৃতি, বিজ্ঞান, সভ্যতা ও মানুষের অস্তিত্বকে বোঝার এক নিজস্ব প্রয়াস।
বিনয় মজুমদারের সঙ্গে ঋত্বিক ঘটকের পরিচয়ের কথাও সাহিত্যিক স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়। তাঁর কবিতা ও জীবনকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে নাট্য ও চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগও হয়েছে।
রুশ ভাষা থেকে তিনি একাধিক বিজ্ঞান ও সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ, পর্যবেক্ষণক্ষমতা এবং অনুসন্ধিৎসু মন কবিতার মধ্যেও স্বাভাবিকভাবে প্রবেশ করেছিল। তাই তাঁর কবিতায় জড়, উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গ, মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে সম্পর্কের অনুসন্ধান বারবার ফিরে আসে।
বিনয় মজুমদারকে নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কেউ তাঁকে কালের কবি বলেছেন, কেউ কালান্তরের কবি। তাঁর কবিতায় রহস্যময়তা আছে, প্রতীকের সন্ধান আছে, জড় ও জীবনের সম্পর্কের অনুসন্ধান আছে। তাঁর কবিতাকে শুধু বইয়ের ফ্ল্যাপ বা প্রচলিত সাহিত্যিক অভিধা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। ‘ভালোবাসা দিতে পারি, তোমরা কি গ্রহণে সক্ষম?’—এই উচ্চারণের মধ্যেই যেন তাঁর কবিসত্তার এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস ও নিঃসঙ্গতা ধরা পড়ে।
রুশ কবি লেরমন্তভ ও পুশকিনের কবিতাও তিনি অনুবাদ করেছিলেন। সমকালীন কবিদের মধ্যে বিষ্ণু দে ও অন্য অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তাঁর গণিত ও বিজ্ঞানমনস্কতার পরিচয় তাঁর গবেষণাধর্মী লেখাতেও পাওয়া যায়।
বিনয় মজুমদার পেয়েছেন কৃত্তিবাস পুরস্কার, রবীন্দ্র পুরস্কার এবং সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। ২০০৫ সালে তাঁর ‘কাব্যসমগ্র ২’-এর জন্য রবীন্দ্র পুরস্কার এবং ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’-এর জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার প্রদান করা হয়। সাহিত্য অকাদেমির নিজস্ব পুরস্কার-তালিকাতেও ২০০৫ সালের বাংলা কবিতার পুরস্কার হিসেবে ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’-এর নাম রয়েছে।
অকৃতদার এই মেধাবী প্রকৌশলী-কবি জীবনের শেষদিকে অসুস্থতা, নিঃসঙ্গতা ও আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটিয়েছেন। কলকাতার নাগরিক জীবন থেকে দূরে ঠাকুরনগরের শিমুলপুরের বাড়িতে তিনি ক্রমশ নিজস্ব এক নিঃসঙ্গ জগৎ তৈরি করেছিলেন। শেষ জীবনেও প্রকৃতির প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল গভীর। পাখি, গাছ, আকাশ, জল—সবকিছুকে তিনি মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেন। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি তাই কেবল দৃশ্য নয়; প্রকৃতি এক ধরনের জিজ্ঞাসা।
জীবনানন্দ দাশ প্রকৃতির মধ্যে যে গভীর অস্তিত্ববোধ আবিষ্কার করেছিলেন, বিনয়ও প্রকৃতির কণ্ঠ শুনেছিলেন নিজের মতো করে। তবে তাঁর পথ ছিল আলাদা—প্রকৃতির সঙ্গে গণিত, বিজ্ঞানের সঙ্গে প্রেম, যুক্তির সঙ্গে রহস্যকে মিলিয়ে নেওয়ার পথ।
সাহিত্যের এই ‘বিজ্ঞানী’ কবি যেন সারসের মতোই কবিতার জগতে প্রবেশ করেছিলেন নিঃশব্দে; আবার প্রস্থানও করেছিলেন নিঃশব্দে। ২০০৬ সালের ১১ ডিসেম্বর উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগরের শিমুলপুরে নিজ বাসভবনে তাঁর মৃত্যু হয়।
মিয়ানমারে জন্ম নেওয়া, ফরিদপুরের মাটিতে শৈশবের স্মৃতি বহন করা এবং পশ্চিমবঙ্গের শিমুলপুরে জীবন কাটানো এই বাঙালি কবির জীবন তাই কেবল একজন কবির জীবন নয়—এ এক অদ্ভুত যাত্রার কাহিনি। গণিত থেকে কবিতা, প্রকৌশল থেকে প্রেম, সীমান্ত থেকে জন্মভূমি, একাকিত্ব থেকে সৃষ্টির জগৎ—সব মিলিয়ে বিনয় মজুমদার বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য ও রহস্যময় অধ্যায়।
মিয়ানমারে জন্ম নেওয়া এই বাঙালি কবির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকবে চির অমলিন।
রেজাউল করিম মুকুল
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ












পাঠক মন্তব্য ও পর্যালোচনা০টি
আপনার মূল্যবান মতামত বা রিভিউ দিন
অতিথি হিসেবে মন্তব্য