নব্বইয়ের দশকে তখন সাদাকালো টেলিভিশন। চৌদ্দ ইঞ্চিই বিশাল ব্যাপার। এন্টেনা বাঁশের মাথায় বাঁধা। একমাত্র বিটিভি দেখা যায়। সব প্রোগ্রাম সময়সূচি একদম মুখস্থ। তখনও হলে গিয়ে আমার সিনেসা দেখার অনুমতি নেই। বিটিভিতে বারবার একটা সিনেমার বিজ্ঞাপন আসতো। দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর 'গরীবের বন্ধু'।
বিজ্ঞাপন দেখেই একপ্রকার সিনেমার ভাব বোঝার চেষ্টা করতাম। নিশ্চয়ই নায়ক গরীবের বন্ধু। এবং মাথায় এও ঘুরপাক খায় যে, নায়ক ধনীর শত্রু।
এরপর স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে মাইকিং চলতেই থাকে 'জন দরদি, গরীবের বন্ধু, মেহনতি মানুষের... ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ ভোটে জিততে হলে গরীবের বন্ধু ও ধনীর শত্রু হতে হয়। কারণ তুলনামূলক ভাবে ধনীদের সংখ্যা কম এবং তাদের পরিকল্পিত পরিবারে ভোটার সংখ্যাও কম। অপরদিকে গরীবের সংখ্যা বেশি, তাদের অপরিকল্পিত পরিবারে ভোটার সংখ্যাও বেশি। ভোরের রাজনীতিতে গরীবের বন্ধু না হলে চলে কেমনে?
তো স্থানীয় সরকার নেতা থেকে শুরু ারে জাতীয় সরকারের নেতাগণ নিশ্চিত ভাবে ধনী এবং গরীবের বন্ধু। তাই তারা নীতিমালা বা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গরীবদের স্বার্থ সংরক্ষণ করেন। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মেশিনারিজ আমদানি করা হয়। স্থানীয় শিল্পে একটা ভটভটি বা নসিমন বানালেও তার কাঁচামাল ও ইঞ্জিন বা মোটর বিদেশী। আর সম্প্রতিকালে ইলেক্ট্রনিক বা ব্যাটারিচালিত যানবাহন ১০০ ভাগ বিদেশী।
বিগত বছরগুলোতে অস্বাভাবিকভাবে অটোরিকশা রাস্তায় নেমেছে৷ ইউনিয়ন পর্যায়ের স্থানীয় বাজার, গ্রাম, উপজেলা এবং জেলা শহর, সেখানেই এদের আধিক্য। এর অবাধ চলাচল রাজধানীতেও ছড়িয়ে পড়েছে। এদেরকে অনেকে আদর করে গরীবের টেসলা নামে ডাকে।
রিকশা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিকশা পেইন্ট খুব নাম করেছে বিভিন্ন ফ্যাশনে ও তৈজসপত্রে। রিকশায় ভ্রমনের প্রধান মজা হলো, এটি দামে সস্তা, সহজলভ্য, হাওযা বাতাস খাওয়া যায়, এবং বাঙ্গালির চিরায়ত স্বভাব যেটি, দরদাম করে ওঠা যায়। বর্তমান কালের ব্যাটারি চালিত রিকশার সন্তোষজনক গতি, কিন্তু তুলনামূলক কম ব্রেকিং ক্যাপাসিটি দুর্ঘটনার কারণ। কিন্তু আমার আলোচনার বিষয়বস্তু 'গরীবের বন্ধু'।
অটোরিকশার বডি বানাতে যে লোহা, ব্যাটারি, মোটর, কন্ট্রোলিং কিট ইত্যাদি সবই আমদানিকৃত পণ্য এবং সরকার নির্ধারিত শুল্ক পরিশোধকৃত। এই অটোরিকশা যখন বিভিন্ন বাসাবাড়িতে চার্জ করে সাধারণত গভীর রাত হতে ভোর অব্দি, সেটির বিদ্যুৎবিল আবাসিক হারে পরিশোধ করে। যদিও তারা আবাসিক হারে বিল পরিশোধ করে বাণিজ্যিক ব্যবহার করছে। কিন্তু শিল্পোৎপাদনে একজন উদ্যোক্তাকে বাণিজ্যিক হারে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হয়। এখানে আমাদের নীতিনির্ধারকেরা 'গরীবের বন্ধু' এবং ধনীর (উদ্যোক্তা) শত্রু প্রমাণিত।
একজন বাইক বা ব্যক্তিগত গাড়ি বা পাবলিক ট্রান্সপোর্টের মালিক আমদানি শুল্ক পরিশোধ করে এবং নিবন্ধনের জন্য সরকার বাহাদুর কর্তৃক ফি জমা দিয়ে নিবন্ধন করে থাকে। বছর বছর রুট পারমিট ও ট্যাক্স টোকন ও ইন্সুরেন্সের নামে যথেষ্ট ফি পরিশোধ করে। কিন্তু আপনি নিজে ড্রাইভ করুন বা দূরপাল্লার আন্তঃজেলা বাসে ভ্রমণ করুন সামনের সিটে বসে, দেখবেন এই টেসলার চনপে ও তাদে অদক্ষ, অনিয়ন্ত্রিত ও আগ্রাসি চলাচলে মহাসড়ককে উচ্চগতিসম্পন্ন গাড়ী চলাচল একপ্রকার কঠিন হয়ে পড়েছে। এই টেসলার নেই উচ্চগতির ক্ষমতা, আবার যেটুকু আছে নেই তার ব্রেকিং ক্যাপাসিটি, আধিক্য, অদক্ষতা, স্থানীয় চালকদের হ্যাডম ও দখলদারিত্ব, বেপরোয়া মানসিকতা, গাড়ীর নিবন্ধন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকার কারণে মামলার ভয় না পাওয়া ইত্যাদি কারণে মহাসড়ক ও বড় শহরগুলো চলাচল দুরূহ হয়ে পড়েছে।
আমাদের 'গরীবের বন্ধু' সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা বছর বছর ফি জমা দেওয়া ধনীদের জন্য কোন নিরাপদ ও অবাধ চলাচলের ব্যবস্থা করতে পারছেন কি? উত্তর না। কারণ তারা একমাত্র মানব কুল যারা ধনী হয়েও ধনীদের শত্রু।
খুব সহজে এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। যেহেতু আমাদের মত এমন গরীব দেশে এই টেসলা অপরিহার্য তাই এটিকে নীতিমালার আওতায় আনা জরুরি। এর জন্য 'গরীবের বন্ধু' এবং 'ধনীর শত্রু' নীতিনির্ধারণী মনভাব থাকলে হবে না।
* এখন প্রায় সারাদেশে প্রিপেইড মিটার। প্রতিটি আবাসিক মিটারে পরিবারের এপ্লায়েন্সেস দেখে ম্যাক্সিমাম লোড সেট করা। যেন কোনভাবেই বাড়িতে এই টেসলা আবাসিক রেটে চার্জ করতে না পারে। চার্জিং এর জন্য বাণিজ্যিক হারে আলাদা ডেডিকেটেড চার্জিং স্টেশন চালু করা।
* ডিজাইনগত পরিবর্তন আনা, তাতে চার চাকা থাকতে পারে, কন্ট্রোলার বাধ্যতামুলক থাকবে এবং তাতে ইলেক্ট্রনিক নিবন্ধন নম্বর থাকবে। যেন পুলিশ মামলার আওতায় নিতে পারে। ক্লোন কন্ট্রোলা দিয়ে যেন টেসলা চলতে না পারে।
* যাত্রী ও চালকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্রেকিং ক্যাপাসিটি বাড়াতে হবে ও সাসপেনশনের গাইডলাইন দিতে হবে।
* টেসলা নির্মানের ক্ষেত্রে দেশে এক্সিষ্টিং ম্যানুফ্যাকচারদের নিয়ে চুড়ান্ত ডিজাইন করতে হবে এবং তাদের দ্বারাই এর ডেভলপমেন্ট করতে হবে।
* নাগরিকদের টেসলা ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করতে ফুটপাত দখলমুক্ত ও হাঁটার উপযোগী করে তুলতে হবে।
* বিকল্প কর্মসংস্থান গড়ে তুলতে হব এবং টেসলা চালানো পেশাকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।
* বার্ষিক ফি প্রদানকারী বিভিন্ন ভেইকেলগুলোর অধিকার (রাইটস) ফিরিয়ে দিতে মহাসড়ক বা সড়ক বা যেকোন পথে বিশেষ রংয়ের দাগ টেনে দিতে হবে যেন টেসলা উচ্চগতির গাড়ীর লেনে কখনও প্রবেশ না করে৷ আইন করতে হবে যে, দাগের পরের দুর্ঘটনায় টেসলা ড্রাইভার দোষী সাব্যস্থ হবে।
* যাত্রী ও চালকদের সচেতনতা বাড়ানোর প্রকল্প হাতে নিতে হবে।
সর্বোপরি আমাদের নীতিনির্ধারকদের শুধুমাত্র 'গরীবের বন্ধু' ও 'ধনীদের শত্রু' হলে চলবে না। ন্যায্যতার ভিত্তিতে সময়োপযোগী নীতিমালা করে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, পুলিশ, বিআরটিএ সবাইকে নিজনিজ বিষয়ে কাজ শুরু করলে ৬ মাসের মধ্যে রিকশা পেইন্টের মত আমাদের গরীবের টেসলা অভিশাপ না হয়ে ঐতিহ্য হয়ে উঠবে।











পাঠক মন্তব্য ও পর্যালোচনা০টি
আপনার মূল্যবান মতামত বা রিভিউ দিন
অতিথি হিসেবে মন্তব্য