আইডিয়া প্রকাশন
আইডিয়া প্রকাশনবই • ইবুক • সম্মানি — মুক্তচিন্তার অসীম সীমানা
Welcome, Guest!
Idea Prokashon

বই কেনা, অর্ডার ট্র্যাকিং ও প্রকাশনা সেবায় যুক্ত হতে একাউন্টে প্রবেশ অথবা নতুন রেজিস্ট্রেশন করুন।

শিশু-কিশোর সাহিত্য১৫অনুবাদ১৪আঞ্চলিক ভাষা ও লোকসাহিত্যউপন্যাসসাহিত্যপত্রিকা/ সাময়িকীকৌতুকজীবনী / সাহিত্যিক জীবনীআঞ্চলিক ইতিহাসভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসশিশু-কিশোর: রহস্য, গোয়েন্দা, ভৌতিক, থ্রিলার ও অ্যাডভেঞ্চারচিরায়ত উপন্যাসশিশু সাহিত্যব্যবসায় শিক্ষা (Business Education)ব্যাংকিং অর্থনীতিগল্পপ্রবন্ধ-নিবন্ধডায়েরি ও চিঠিপত্র সংকলনবিজ্ঞানী ও গণিতবিদশিশু-কিশোর গল্পউঠতি বয়সীদের গণিত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমায়া সভ্যতাবিশ্বসাহিত্য / জার্মান সাহিত্যকিশোর ক্লাসিকসকাব্যনাট্যগল্পসমগ্রসায়েন্স ফিকশনরহস্য উপন্যাসমুক্তিযুদ্ধউপন্যাস অনুবাদদর্শনপ্রবন্ধশ্রেষ্ঠ কবিতাপ্রকৃতি ও পরিবেশকবিতাভৌগলিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যআইন ও বিচারবিবিধ
গ্রাহক সহায়তা কেন্দ্র:সকাল ৯টা - রাত ১১টা
ভাষা নির্বাচন / Language:বাংলা
থিম মোড / Theme:
প্রবন্ধ-নিবন্ধ
আইডিয়া সাহিত্যপত্র৩৬ মিনিট পাঠ৫,৬৭১ শব্দ

অমর্ত্য সেন: মানুষ ও ন্যায় প্রসঙ্গ

অমর্ত্য সেন: মানুষ ও ন্যায় প্রসঙ্গ
কভার চিত্র: অমর্ত্য সেন: মানুষ ও ন্যায় প্রসঙ্গআইডিয়া সাহিত্য সাময়িকী
অমর্ত্য সেনকে অর্থনীতিবিদ বলা হয়। বলা হয় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ। পরিচয়ের দিক থেকে কথাটি নিঃসন্দেহে সত্য, কিন্তু তাঁর চিন্তার বিস্তারের তুলনায় সত্যটি অসম্পূর্ণ। তাঁকে শুধু অর্থনীতিবিদ বললে যেন একটি...

অমর্ত্য সেনকে অর্থনীতিবিদ বলা হয়। বলা হয় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ। পরিচয়ের দিক থেকে কথাটি নিঃসন্দেহে সত্য, কিন্তু তাঁর চিন্তার বিস্তারের তুলনায় সত্যটি অসম্পূর্ণ। তাঁকে শুধু অর্থনীতিবিদ বললে যেন একটি বিশাল নদীকে তার একটি মাত্র ঘাট দিয়ে চেনার চেষ্টা করা হয়। তাঁর অর্থনীতি মানুষের ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অসাম্য ও বঞ্চনার মধ্যে দিয়ে নৈতিকতার দিকে এগিয়ে যায়; তাঁর দর্শন আবার মানুষের বাস্তব জীবন, রাষ্ট্রের নীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে ফিরে আসে। অর্থনীতি ও দর্শনের এই যাতায়াতই তাঁর চিন্তার প্রাণ।

অমর্ত্য সেনের জন্ম ১৯৩৩ সালে। দীর্ঘ একাডেমিক জীবনে তিনি অর্থনীতি ও দর্শনের এমন এক সংলাপ তৈরি করেছেন, যার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ। মানুষ কীভাবে বেঁচে আছে, কী করতে পারছে, কী হতে পারছে, তার স্বাধীনতা কতখানি, তার কণ্ঠস্বর কতটা শোনা যাচ্ছে এবং সমাজের সম্পদ ও সুযোগের বণ্টনে সে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে—এসব প্রশ্ন তাঁর কাজের ভেতর বারবার ফিরে এসেছে। এই কারণে তাঁকে পুরোনো অর্থে একজন রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ বলা যায়; সেই অর্থে, যে অর্থে অ্যাডাম স্মিথ, জন স্টুয়ার্ট মিল বা কার্ল মার্ক্স অর্থনীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মানুষ, নৈতিকতা, রাজনীতি ও সমাজের প্রশ্নকে কখনো আলাদা করে দেখেননি।

অমর্ত্য সেনের বৌদ্ধিক জগতের দিকে তাকালে প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো তাঁর একক কোনো মতাদর্শের কাছে আত্মসমর্পণ না করা। অ্যাডাম স্মিথ তাঁর কাছে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, কার্ল মার্ক্সও তেমনি। জন রলসের সঙ্গে তাঁর গভীর তাত্ত্বিক সংলাপ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারতীয় চিন্তার দীর্ঘ যুক্তিবাদী ও বহুত্ববাদী ঐতিহ্যও তাঁর চিন্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি পশ্চিমকে গ্রহণ করেছেন, কিন্তু পশ্চিমের একচেটিয়া বৌদ্ধিক কর্তৃত্বকে গ্রহণ করেননি; ভারতীয় ঐতিহ্যের দিকে ফিরে গেছেন, কিন্তু তার রোমান্টিক মহিমাকীর্তনও করেননি। তাঁর কাছে সত্যের কোনো ভৌগোলিক ঠিকানা নেই।

এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি নৈতিক তাৎপর্য আছে। আমরা সাধারণত পৃথিবীকে দেখি নিজের অবস্থান থেকে। যে সমাজে জন্মেছি, যে সংস্কৃতিতে বড় হয়েছি, যে রাজনৈতিক মতকে সত্য বলে বিশ্বাস করি, সেই অবস্থান থেকেই অন্য সবকিছুকে বিচার করতে অভ্যস্ত। অমর্ত্য সেন সেই স্বাভাবিক আত্মকেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ান। তিনি আমাদের নিজের অবস্থান থেকে সামান্য সরে এসে অন্যের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখতে বলেন। তাঁর কাছে এই সরে দাঁড়ানোর নামই এক অর্থে নৈতিক নিরপেক্ষতা।

অ্যাডাম স্মিথের “impartial spectator” বা নিরপেক্ষ দর্শকের ধারণার প্রতি তাঁর আকর্ষণের কারণও এখানেই। নিরপেক্ষ দর্শক এমন কেউ নন, যার কোনো মত নেই। বরং তিনি এমন একজন, যিনি নিজের স্বার্থ ও পূর্বধারণার বাইরে দাঁড়িয়ে কোনো পরিস্থিতিকে বিচার করার চেষ্টা করেন। আমরা কী চাই, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—একই পরিস্থিতি অন্য একজন মানুষের জীবনে কী অর্থ বহন করছে।

এই ভাবনাটি অমর্ত্য সেনের অর্থনৈতিক কাজের মধ্যেও গভীরভাবে প্রবাহিত। অর্থনীতির প্রচলিত ভাষায় দারিদ্র্যকে প্রায়ই আয়ের ঘাটতি হিসেবে দেখা হয়। একজন মানুষের আয় কত, তার হাতে কত সম্পদ, সে কতটা ভোগ করতে পারে—এসব দিয়ে তার অবস্থান মাপা হয়। কিন্তু অমর্ত্য সেন প্রশ্ন করেন, একই পরিমাণ সম্পদ কি প্রত্যেক মানুষের জন্য একই স্বাধীনতা তৈরি করে?

উত্তরটি স্পষ্টতই না।

একজন সুস্থ মানুষের হাতে যে আয় একটি স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করে, একজন প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য একই আয় হয়তো পর্যাপ্ত নয়। একজন শিক্ষিত মানুষের হাতে অর্থ যে সুযোগ সৃষ্টি করে, অশিক্ষিত মানুষের ক্ষেত্রে তা একই ফল নাও দিতে পারে। একজন নারীর পরিবারের মোট সম্পদের অংশীদার হওয়া আর সেই সম্পদের ওপর নিজের কার্যকর অধিকার থাকা এক কথা নয়। অর্থাৎ সম্পদ নিজে শেষ কথা নয়; সম্পদ মানুষকে কী করতে সক্ষম করছে, সেটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

এই ভাবনা থেকেই গড়ে ওঠে তাঁর capability approach—মানব সক্ষমতা-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি। মানুষের কল্যাণকে কেবল তার আয় বা সম্পদের পরিমাণ দিয়ে নয়, তার বাস্তব সক্ষমতার আলোকে বিচার করতে হবে। সে কি সুস্থ থাকতে পারে? শিক্ষিত হতে পারে? নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে? সমাজে মর্যাদার সঙ্গে অংশ নিতে পারে? রাজনৈতিকভাবে কথা বলতে পারে? নিজের জীবন সম্পর্কে বেছে নেওয়ার বাস্তব সুযোগ কি তার আছে?

এই প্রশ্নগুলো অর্থনীতির প্রচলিত পরিমাপকে এক নতুন নৈতিক মাত্রা দেয়।

এখানে অমর্ত্য সেনের ব্যবহারিক অর্থনীতির গুরুত্ব বিশেষভাবে বোঝা যায়। তাঁর অর্থনীতি কোনো বিমূর্ত সংখ্যার জগতে আটকে নেই। তাঁর গবেষণার বিষয় হয়েছে দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, নারীর বঞ্চনা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অসমতা এবং মানুষের জীবনযাপনের বাস্তব সুযোগ। তাঁর কাছে অর্থনৈতিক তত্ত্ব তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের বাস্তব দুর্দশাকে বুঝতে এবং কমাতে সাহায্য করে।

দুর্ভিক্ষের কথাই ধরা যাক। দীর্ঘদিন ধরে একটি সরল ধারণা ছিল—দুর্ভিক্ষ মানে খাদ্যের অভাব। কোনো দেশে খাদ্য কমে গেলে মানুষ না খেয়ে মারা যায়। কিন্তু অমর্ত্য সেন এই ব্যাখ্যার ভেতরে একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রবেশ করালেন: সমাজে খাদ্য আছে, তবু কিছু মানুষ কেন অনাহারে মারা যায়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি নিয়ে এলেন “entitlement” বা খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সম্পদের ওপর মানুষের কার্যকর প্রাপ্যতা ও অধিকার-সম্পর্কের ধারণা। সমাজে খাদ্য থাকা মানেই প্রত্যেক মানুষের খাদ্য পাওয়ার ক্ষমতা থাকা নয়। একজন শ্রমিকের কাজ হারিয়ে যেতে পারে, তার মজুরি কমে যেতে পারে, খাদ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে; ফলে বাজারে খাদ্য থাকা সত্ত্বেও তার কাছে খাদ্য পৌঁছানোর অর্থনৈতিক পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

অর্থাৎ দুর্ভিক্ষ শুধু খাদ্যের পরিমাণের প্রশ্ন নয়; এটি অধিকার, আয়, বাজার, কর্মসংস্থান ও ক্ষমতার প্রশ্ন।

১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ অমর্ত্য সেনের জীবন ও চিন্তায় একটি গভীর ছাপ ফেলেছিল। শৈশবে দেখা সেই মৃত্যুমিছিল পরবর্তী জীবনে একটি অর্থনৈতিক প্রশ্নে রূপান্তরিত হয়েছিল। মানুষের চারপাশে খাদ্য থাকতে পারে, অথচ মানুষ খাদ্য না পেয়ে মারা যেতে পারে—এই আপাতবিরোধের মধ্যেই তিনি অর্থনীতির একটি গভীর নৈতিক সত্য খুঁজে পান।

এখানে অর্থনীতি হঠাৎ রাজনীতির মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। কে খাদ্য পাবে, কে পাবে না—এটি শুধু বাজারের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের নীতি, কর্মসংস্থান, মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতারও প্রশ্ন।

আর এখানেই অমর্ত্য সেনের কাছে গণতন্ত্রের অর্থ নতুনভাবে প্রকাশিত হয়।

একটি ক্ষুধার্ত মানুষ যদি তার ক্ষুধার কথা বলতে না পারে, একটি সংবাদপত্র যদি সেই ক্ষুধার খবর প্রকাশ করতে না পারে, বিরোধী দল যদি সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে না পারে, তাহলে দুর্ভিক্ষ কেবল খাদ্যের সংকট থাকে না—তা হয়ে ওঠে নীরবতার সংকট। যে সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করে না, তার কাছে অনাহারী মানুষের মৃত্যু রাজনৈতিকভাবে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। কিন্তু একটি কার্যকর গণতন্ত্রে ক্ষুধা একটি রাজনৈতিক ঘটনা। মানুষের মৃত্যু প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়; সংবাদমাধ্যম তা প্রকাশ করে; বিরোধিতা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

এই কারণে অমর্ত্য সেনের কাছে গণতন্ত্র কেবল ভোটের ব্যবস্থা নয়। গণতন্ত্র মানুষের কথা বলার অধিকার, প্রশ্ন করার অধিকার, সরকারের সমালোচনা করার অধিকার এবং জনপরিসরে যুক্তি বিনিময়ের সুযোগ। এই অর্থে গণতন্ত্র মানুষের জীবনরক্ষারও একটি ব্যবস্থা।

এখানে তাঁর অর্থনীতি ও রাজনৈতিক দর্শন একই স্রোতে এসে মিশে যায়।

একদিকে তিনি দেখান, খাদ্য থাকা সত্ত্বেও মানুষ ক্ষুধার্ত হতে পারে; অন্যদিকে দেখান, মানুষের কণ্ঠস্বর থাকলে সেই ক্ষুধা রাষ্ট্রের কাছে দৃশ্যমান হয়। অর্থনৈতিক বঞ্চনা তাই রাজনৈতিক নীরবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। আর রাজনৈতিক স্বাধীনতা তাই নিছক একটি বিমূর্ত অধিকার নয়; তা মানুষের জীবনের বস্তুগত নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিই অমর্ত্য সেনের চিন্তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি। তাঁর কাছে অর্থনীতি কোনো আলাদা ঘরে বসে থাকা বিজ্ঞান নয়। মানুষের ক্ষুধা যখন রাজনৈতিক হয়ে ওঠে, অর্থনীতি তখন রাজনীতির দিকে তাকায়। মানুষের স্বাধীনতা যখন সম্পদের অভাবে সংকুচিত হয়, রাজনৈতিক দর্শন তখন অর্থনীতির দিকে ফিরে তাকায়।

নারীর জীবন ও অবস্থান নিয়ে অমর্ত্য সেনের গবেষণাও এই একই বৌদ্ধিক পথ অনুসরণ করে। তাঁর লেখা গবেষণামূলক প্রবন্ধ “More Than 100 Million Women Are Missing”—এই শিরোনামটি একসময় পৃথিবীর বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। প্রশ্নটি ছিল সহজ, কিন্তু উত্তরটি সহজ ছিল না: পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে নারীর সংখ্যা প্রত্যাশিত অনুপাতের তুলনায় এত কম কেন?

শুধু দারিদ্র্য দিয়ে এর উত্তর দেওয়া যায় না। কারণ পৃথিবীর দরিদ্রতম অঞ্চলগুলোর মধ্যে এমন সমাজও আছে, যেখানে নারী-পুরুষের জনসংখ্যাগত ভারসাম্য তুলনামূলকভাবে ভালো। আবার একই দেশের ভেতরেও অঞ্চলভেদে এই অনুপাতের বড় পার্থক্য দেখা যায়।

তাহলে সমস্যাটি কোথায়?

অমর্ত্য সেন আমাদের দৃষ্টি নিয়ে যান পরিবারের ভেতরের ক্ষমতার দিকে। পরিবারের মোট সম্পদ কত, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ—সেই সম্পদের ওপর কার কতটা অধিকার। একজন নারী পরিবারের সদস্য হলেও যদি খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার কণ্ঠস্বর দুর্বল হয়, তাহলে পরিবারের মোট আয় দিয়ে তার জীবনকে বোঝা যায় না।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এখানে একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়। যে নারী উপার্জন করেন, কর্মক্ষেত্রে অংশ নেন, নিজের আয় ও সম্পদের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ রাখেন, তাঁর দর-কষাকষির ক্ষমতা অন্যরকম। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তাঁর সামাজিক অবস্থানকে বদলে দিতে পারে। নিজের জীবন ও সন্তানের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও বাড়তে পারে।

এখানেই আবার capability-এর প্রশ্ন ফিরে আসে। মানুষের হাতে কী আছে, তার চেয়ে সে কী করতে পারে—এই পার্থক্যটি অমর্ত্য সেনের চিন্তার কেন্দ্রে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের উন্নয়নের প্রচলিত ধারণাকেও প্রশ্ন করতে শেখায়। একটি দেশের মাথাপিছু আয় বাড়লেই কি মানুষের জীবন উন্নত হয়েছে? অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেই কি স্বাধীনতা বেড়েছে? বাজার সম্প্রসারিত হলেই কি নারীর ক্ষমতা বেড়েছে? রাষ্ট্রের আয় বাড়লেই কি শিশুর স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে?

অমর্ত্য সেনের উত্তর হবে—এগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু যথেষ্ট নয়।

উন্নয়নকে তিনি মানুষের স্বাধীনতার সম্প্রসারণ হিসেবে দেখেন। Development as Freedom-এ এই ধারণা বিশেষভাবে বিকশিত হয়েছে। অর্থনৈতিক সুযোগ, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক সুযোগ, স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা—এসব পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। মানুষের হাতে শুধু অর্থ দেওয়া নয়; তার সামনে এমন জীবনযাপনের বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি করা জরুরি, যা সে মূল্যবান বলে মনে করে।

এই কারণে তাঁর উন্নয়ন-চিন্তা GDP-এর বিরুদ্ধে নয়; বরং GDP-কে যথাস্থানে বসানোর চেষ্টা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা মানুষের সুযোগ বাড়াতে পারে। কিন্তু প্রবৃদ্ধি নিজেই উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। যদি অর্থনীতি বাড়ে অথচ ক্ষুধা, অসুস্থতা, অশিক্ষা ও সামাজিক বঞ্চনা থেকে যায়, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধির মানবিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।

এই প্রশ্নের সঙ্গে তাঁর কল্যাণ অর্থনীতির সম্পর্ক গভীর। প্রচলিত welfare economics-এ মানুষের কল্যাণকে তুলনা করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন, মানুষের কল্যাণকে কেবল উপযোগ বা সন্তুষ্টির মাধ্যমে বোঝা কঠিন। মানুষ অনেক সময় দীর্ঘ বঞ্চনের কারণে নিজের প্রত্যাশা কমিয়ে ফেলে। ফলে যে মানুষ সামান্য পেয়েও সন্তুষ্ট, তাকে প্রকৃত অর্থে ভালো অবস্থায় আছে বলা যায় না।

মানুষ কী চায়—এটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সে কী পেতে পারছে, কী করতে পারছে, এবং তার সামনে কী সম্ভাবনা খোলা আছে—সেগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে তাঁর সামাজিক পছন্দের তত্ত্বের গুরুত্ব আসে। একটি সমাজে মানুষের পছন্দ ভিন্ন হতে পারে। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের মূল্যবোধ, অভিজ্ঞতা ও স্বার্থের আলোকে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সমাজকে কোনো না কোনোভাবে এই বিচিত্র পছন্দের মধ্যে থেকে একটি সমষ্টিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়।

এই সমস্যা অর্থনীতির যেমন, গণতন্ত্রেরও। ভোট কীভাবে সমষ্টিগত পছন্দ প্রকাশ করে? মানুষের বিভিন্ন মূল্যবোধ কীভাবে একত্রিত হবে? সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত কি সব সময় ন্যায়সংগত? একটি সিদ্ধান্তে কার কণ্ঠস্বর কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে?

এই প্রশ্নগুলো দেখায়, অর্থনীতি ও গণতন্ত্রের মধ্যে যে দূরত্ব আমরা ধরে নিই, তা আসলে অনেক কম।

অমর্ত্য সেনের ১৯৭৭ সালের “Rational Fools” প্রবন্ধও এই বৃহত্তর মানবিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ দলিল। অর্থনীতির প্রচলিত মডেলে মানুষকে অনেক সময় এমন এক যুক্তিসংগত সত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয়, যে নিজের স্বার্থসিদ্ধির সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। কিন্তু বাস্তব মানুষ কি কেবল নিজের লাভের জন্য বাঁচে?

একজন মানুষ বন্ধুর জন্য নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিতে পারে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের ক্ষতি মেনে নিতে পারে। নিজের দেশের বাইরে কোনো অচেনা মানুষের দুর্দশাতেও বিচলিত হতে পারে। ন্যায়, কর্তব্য, ভালোবাসা, সহমর্মিতা কিংবা সামাজিক দায়বদ্ধতা তার আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।

অমর্ত্য সেনের কাছে যুক্তিবোধের অর্থ তাই নিছক স্বার্থপরতা নয়। মানুষ অন্যের কল্যাণ নিয়ে ভাবতে পারে—এটিও যুক্তিসংগত মানবিক আচরণের অংশ।

এই জায়গায় তাঁর অর্থনীতি নৈতিক দর্শনের দিকে এগিয়ে যায়।

আর নৈতিক দর্শন তাঁকে নিয়ে যায় ন্যায়বিচারের প্রশ্নে। The Idea of Justice-এ অমর্ত্য সেন মূলত প্রশ্ন করেন—ন্যায়বিচার নিয়ে আমাদের কীভাবে চিন্তা করা উচিত?

এই প্রশ্নে তাঁর প্রধান সংলাপ জন রলসের সঙ্গে। রলস আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনে একটি অসামান্য তাত্ত্বিক নির্মাণ করেছিলেন। “Justice as Fairness”, “Original Position” এবং “Veil of Ignorance”—এসব ধারণার মাধ্যমে তিনি এমন একটি সমাজের নৈতিক ভিত্তি নির্মাণের চেষ্টা করেন, যেখানে মানুষ জানে না সমাজে তার নিজের অবস্থান কী হবে। সে জানে না সে ধনী না দরিদ্র, সংখ্যাগরিষ্ঠ না সংখ্যালঘু, সুস্থ না অসুস্থ, প্রতিভাবান না সাধারণ।

এই অজ্ঞতার আবরণ মানুষকে এমন নীতি বেছে নিতে বাধ্য করবে, যা তার সম্ভাব্য সব অবস্থানেই ন্যায্য।

রলসের এই চিন্তা আধুনিক ন্যায়বিচার-তত্ত্বে এক বিশাল পরিবর্তন এনেছিল। কিন্তু অমর্ত্য সেন প্রশ্ন তুললেন—ন্যায়বিচারের জন্য কি সত্যিই একটি নিখুঁত আদর্শ সমাজের নকশা আমাদের দরকার?

তাঁর উত্তর—অবশ্যই নয়।

বাস্তব পৃথিবীতে আমরা খুব কমই একটি নিখুঁত পৃথিবী আর একটি অসম্পূর্ণ পৃথিবীর মধ্যে নির্বাচন করি। বরং আমাদের সামনে থাকে দুটি অসম্পূর্ণ ব্যবস্থা। প্রশ্ন হয়—কোনটি তুলনামূলকভাবে ভালো? কোনটি কম অন্যায়? কোনটি বেশি মানুষকে স্বাধীনতা দেয়? কোনটি দরিদ্র মানুষের অবস্থার উন্নতি করে?

এই তুলনামূলক ন্যায়বিচারের ধারণাই অমর্ত্য সেনের রাজনৈতিক দর্শনের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য।

তাঁর বিখ্যাত বাঁশির গল্পটি এই ধারণাকে অসাধারণ সরলতায় প্রকাশ করে। তিন শিশু—অ্যান, বব ও কার্লা—একটি বাঁশির মালিকানা দাবি করছে। অ্যান বলে, সে-ই বাঁশি বাজাতে পারে। বব বলে, অন্যদের খেলনা আছে, তার নেই। কার্লা বলে, বাঁশিটি সে নিজেই তৈরি করেছে।

তিনটি দাবিই যুক্তিসঙ্গত।

অ্যানের পক্ষে দক্ষতা ও আনন্দের যুক্তি আছে। ববের পক্ষে সমতার যুক্তি আছে। কার্লার পক্ষে শ্রম ও অধিকারবোধের যুক্তি আছে।

তাহলে ন্যায় কোনটি?

অমর্ত্য সেনের উত্তর হলো—একটি মাত্র উত্তরকে অনিবার্যভাবে সঠিক বলে ধরে নেওয়ার কারণ নেই। বিভিন্ন নৈতিক অবস্থান থেকে ভিন্ন সিদ্ধান্ত যুক্তিসঙ্গত হতে পারে।

এই গল্পটি আসলে আধুনিক সমাজের একটি গভীর সত্যকে ধারণ করে। ন্যায়বিচারের প্রশ্নে মানুষ সব সময় একই মূল্যবোধে একমত হবে না। কেউ সমতাকে অগ্রাধিকার দেবে, কেউ স্বাধীনতাকে, কেউ দক্ষতাকে, কেউ অধিকারকে। একটি বহুত্ববাদী সমাজে এই মতভেদকে মুছে ফেলার চেয়ে যুক্তির মাধ্যমে তার সঙ্গে বসবাস করাই গুরুত্বপূর্ণ।

অমর্ত্য সেনের কাছে তাই ন্যায়বিচার কোনো একক তাত্ত্বিক সূত্রের বন্দি নয়। বরং এটি একটি তুলনামূলক বিচারপ্রক্রিয়া—যেখানে আমাদের দেখতে হয় কোন বাস্তব ব্যবস্থায় অন্যায় কম, স্বাধীনতা বেশি, এবং মানুষের জীবনযাপনের সুযোগ বিস্তৃত।

এইখানে অমর্ত্য সেনের সঙ্গে রলসের পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট হয়। রলসের দৃষ্টি অনেকাংশে “কেমন একটি ন্যায়সংগত সমাজ হওয়া উচিত”—এই প্রশ্নের দিকে। অমর্ত্য সেনের দৃষ্টি বেশি করে “বর্তমানের কোন অন্যায় আমরা কমাতে পারি”—এই প্রশ্নের দিকে।

এই পার্থক্য সামান্য মনে হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। কারণ একটি নিখুঁত সমাজের নকশা নির্মাণের জন্য আমাদের অনেক সময় এমন সব শর্তের কথা ভাবতে হয়, যা বাস্তবে কখনো অর্জিত হবে না। কিন্তু বাস্তব রাজনীতি অপেক্ষা করে না। ক্ষুধার্ত মানুষ আজই খাদ্য চায়। অসুস্থ মানুষ আজই চিকিৎসা চায়। একটি বঞ্চিত শিশুর শিক্ষার সুযোগ আজই দরকার।

ন্যায়বিচারের কাজ তাই ভবিষ্যতের নিখুঁত পৃথিবীর ছবি আঁকা নয় শুধু; বর্তমানের অসম্পূর্ণ পৃথিবীকে কিছুটা ভালো করা।

অমর্ত্য সেনের এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাঁর “niti” ও “nyaya”-এর পার্থক্যও যুক্ত। একটি সমাজে ন্যায্য নিয়ম থাকতে পারে, সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে, সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হতে পারে—কিন্তু তার ফল যদি মানুষের জীবনকে আরও বঞ্চিত করে, তাহলে কেবল প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক সঠিকতা দিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয় না।

একটি দেশের সংবিধানে সমান অধিকার লেখা থাকতে পারে; কিন্তু দরিদ্র মানুষ যদি সেই অধিকার আদালতে প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তবে আনুষ্ঠানিক অধিকার আর বাস্তব অধিকারের মধ্যে ফাঁক থেকে যায়। নির্বাচনে সবাই ভোট দিতে পারে; কিন্তু যদি কোনো গোষ্ঠীর কথা রাজনৈতিক আলোচনায় প্রবেশের সুযোগ না পায়, তবে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিকতা তার পূর্ণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না।

অমর্ত্য সেনের কাছে তাই প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি তার বাস্তব ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।

এই চিন্তার সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য—জনপরিসরে যুক্তি—ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। গণতন্ত্রের প্রাণ কেবল ভোট নয়; আলোচনা। কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়; যুক্তি। কেবল সরকার গঠন নয়; সরকারের সমালোচনা করার স্বাধীনতা।

গণতন্ত্রে মানুষ শুধু পাঁচ বছর পরপর ভোট দেয় না। প্রতিদিন সে কথা বলে, প্রশ্ন করে, বিরোধিতা করে, সংবাদ পড়ে, মতামত গঠন করে, অন্যের মত শোনে এবং রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিচার করে। এই অবিরাম জনআলোচনাই গণতন্ত্রকে জীবন্ত রাখে।

অমর্ত্য সেনের কাছে মুক্ত সংবাদমাধ্যমের মূল্য এখানেই। সংবাদমাধ্যম শুধু খবর দেয় না; সমাজের অদৃশ্য মানুষকে দৃশ্যমান করে। যে ক্ষুধা ক্ষমতাবানরা দেখতে পায় না, সংবাদমাধ্যম তা সামনে আনতে পারে। যে অন্যায় রাষ্ট্রের নথিতে নেই, জনপরিসরে তা আলোচনায় আসতে পারে।

এই কারণেই দুর্ভিক্ষ ও গণতন্ত্রের মধ্যে তাঁর যে সম্পর্কটি আমরা দেখি, সেটি আসলে তাঁর সমগ্র দর্শনের প্রতীক। মানুষের কণ্ঠস্বর ও মানুষের খাদ্য—দুটিকে তিনি একই মানবিক প্রশ্নের অংশ হিসেবে দেখেন।

এখানেই তাঁর চিন্তা আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের দিকে এগিয়ে যায়।

আধুনিক পৃথিবী আর বিচ্ছিন্ন দ্বীপের সমষ্টি নয়। একটি দেশের শিল্প অন্য দেশের বায়ুকে প্রভাবিত করতে পারে। একটি দেশের আর্থিক সংকট অন্য দেশের শ্রমিকের জীবন বদলে দিতে পারে। একটি দেশের যুদ্ধ বহু সীমান্ত পেরিয়ে মানুষের জীবন ধ্বংস করতে পারে। একটি দেশের বাণিজ্যনীতি অন্য দেশের কৃষককে প্রভাবিত করতে পারে। প্রযুক্তি, পরিবেশ, অভিবাসন ও নিরাপত্তা—সবকিছু আমাদের পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়িয়েছে।

তাহলে ন্যায়বিচারের সীমানা কোথায়?

শুধু রাষ্ট্রের সীমান্তে?

অমর্ত্য সেনের চিন্তা সেই সীমারেখাকে প্রশ্ন করে। একজন মানুষের কষ্টকে শুধু “অন্য দেশের সমস্যা” বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। পৃথিবীর এক অংশের সমৃদ্ধি যদি অন্য অংশের মানুষের বঞ্চনার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তবে সেই সম্পর্কের নৈতিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।

এখানে তাঁর সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদও গুরুত্বপূর্ণ। The Argumentative Indian-এ তিনি ভারতীয় সভ্যতার এমন ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে বিতর্ক, যুক্তি ও মতবিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। যুক্তিবাদ, সহনশীলতা কিংবা স্বাধীনতার ধারণা কেবল পশ্চিমা সভ্যতার দান—এই ধারণা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

কিন্তু তিনি বিপরীত চরমপন্থাটিও গ্রহণ করেন না। অর্থাৎ পশ্চিমা চিন্তার সবকিছুই সাম্রাজ্যবাদী বলে বাতিল করে দেওয়া তাঁর পদ্ধতি নয়। তাঁর কাছে যুক্তি ও ন্যায়ের অনুসন্ধান মানবজাতির যৌথ উত্তরাধিকার।

এই অবস্থান তাঁকে একই সঙ্গে উদারনৈতিক এবং বহুত্ববাদী করে তোলে। তিনি স্বাধীনতার পক্ষে, কিন্তু কোনো একক সভ্যতার নামে স্বাধীনতার মালিকানা দাবি করেন না। তিনি যুক্তির পক্ষে, কিন্তু যুক্তিকে কোনো একটি সাংস্কৃতিক ভূখণ্ডের সম্পত্তি মনে করেন না।

এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের পৃথিবীতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের সময়ে একদিকে যেমন সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ববোধ আছে, অন্যদিকে তেমনি সব মূল্যবোধকে সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতার নামে সমানভাবে প্রশ্নাতীত করে তোলার প্রবণতাও আছে। অমর্ত্য সেন এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলেন—মানুষের যুক্তি ও ন্যায়বোধের মধ্যে আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ সম্ভব।

তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত এই সংলাপের ধারণা।

অমর্ত্য সেন কোনো চূড়ান্ত মতের রাজনীতি করেন না। তিনি আমাদের চিন্তার পদ্ধতি নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তিনি চান আমরা নিজেদের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করি। যে প্রতিষ্ঠানকে স্বাভাবিক বলে মনে হয়, তার ফলাফল পরীক্ষা করি। যে নীতিকে ন্যায্য বলে মনে হয়, তার দ্বারা কার জীবন উন্নত হচ্ছে এবং কার জীবন সংকুচিত হচ্ছে তা দেখি।

এ কারণেই মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্নে তাঁর অবস্থানও কেবল “মৃত্যুদণ্ড ভালো না খারাপ”—এই দ্বৈততার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি আমাদের জিজ্ঞাসা করতে বলেন: অন্য সমাজের অভিজ্ঞতা কী বলছে? বিচারব্যবস্থার ভুলের ইতিহাস কী? ভুল দণ্ডাদেশের সম্ভাবনা কতটা? অন্য দেশগুলো কেন মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করেছে? আমাদের নিজেদের অবস্থানকে একজন নিরপেক্ষ দর্শকের দৃষ্টিতে দেখলে কি একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাব?

এই পদ্ধতির সৌন্দর্য হলো—এটি নিজের মতের বিরুদ্ধেও যুক্তির দরজা খোলা রাখে।

ন্যায়বিচারের জন্য এই মানসিকতা অপরিহার্য। কারণ অন্যায় প্রায়ই নিজেকে অন্যায় বলে পরিচয় দেয় না। একটি সামাজিক রীতি দীর্ঘদিন প্রচলিত থাকলে মানুষ তাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে পারে। একটি বৈষম্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম চললে তা সংস্কৃতির অংশ বলে মনে হতে পারে। একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বহু মানুষের সুবিধা নিশ্চিত করলে তার আড়ালে অন্যদের বঞ্চনা চোখে না-ও পড়তে পারে।

নিরপেক্ষ দর্শক সেই স্বাভাবিকতার মধ্যে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেন: যদি আমি ওই মানুষের জায়গায় থাকতাম?

এই একটিমাত্র প্রশ্নের নৈতিক শক্তি অসাধারণ।

আমি যদি ধনী না হয়ে দরিদ্র হতাম? সংখ্যাগরিষ্ঠ না হয়ে সংখ্যালঘু হতাম? পুরুষ না হয়ে নারী হতাম? সুস্থ না হয়ে প্রতিবন্ধী হতাম? নিরাপদ দেশে না জন্মে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে জন্মাতাম?

সমাজের নিয়মগুলো কি তখনও আমার কাছে ন্যায়সংগত মনে হতো?

অমর্ত্য সেনের রাজনৈতিক দর্শনের একটি বড় শক্তি হলো, তিনি আমাদের এই কাল্পনিক স্থানান্তর ঘটাতে বাধ্য করেন।

এই স্থানান্তরই capability approach-এর নৈতিক ভিত্তি। অন্যের হাতে কত সম্পদ আছে তা দেখার আগে দেখতে হবে, সে সেই সম্পদ দিয়ে কী করতে পারছে। অন্যের কাছে আইনগত অধিকার আছে কি না, তার পাশাপাশি দেখতে হবে সে সেই অধিকার বাস্তবে ব্যবহার করতে পারছে কি না। অন্যের কাছে ভোট আছে কি না, তার পাশাপাশি দেখতে হবে তার কণ্ঠস্বর রাজনৈতিকভাবে কার্যকর কি না।

অর্থাৎ মানুষের জীবনকে তার বাস্তব সম্ভাবনার আলোকে দেখতে হবে।

এই কারণে অমর্ত্য সেনের অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত একটি মানবিক অর্থনীতি। তাঁর কাছে পরিসংখ্যান মানুষের বিকল্প নয়; পরিসংখ্যান মানুষের জীবনকে বোঝার একটি উপায়। মাথাপিছু আয় একটি তথ্য; কিন্তু সেই আয়ের পেছনে মানুষের জীবন কী রকম, সেটিই আসল প্রশ্ন। দারিদ্র্যের হার একটি সংখ্যা; কিন্তু সেই সংখ্যার ভেতরে কতজন শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, কতজন নারী চিকিৎসা পাচ্ছেন না, কতজন মানুষ শিক্ষার সুযোগ থেকে বাদ পড়ছে—সেটিই অর্থনীতির মানবিক মুখ।

এই জায়গায় তাঁর ব্যবহারিক অর্থনীতি ও রাজনৈতিক দর্শন পরস্পরের হাত ধরে হাঁটে।

একটি ভালো অর্থনৈতিক নীতি শুধু বাজারকে দক্ষ করবে না; মানুষের জীবনকে প্রসারিত করবে। একটি ভালো সামাজিক নীতি শুধু সম্পদ বণ্টন করবে না; মানুষের সক্ষমতা বাড়াবে। একটি ভালো গণতন্ত্র শুধু সরকার নির্বাচন করবে না; মানুষকে কথা বলার শক্তি দেবে।

এই ত্রিভুজ—অর্থনীতি, স্বাধীনতা ও ন্যায়—অমর্ত্য সেনের চিন্তার কেন্দ্রে।

অমর্ত্য সেনের চিন্তার একটি সম্ভাব্য দুর্বলতা এখানেই যে তাঁর উত্তরগুলো সব সময় খুব নির্দিষ্ট নয়। তিনি আমাদের বলেন কোন প্রশ্ন করতে হবে, কোন বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে, কোন বঞ্চনাকে দেখতে হবে; কিন্তু প্রতিটি সমস্যার জন্য একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নীলনকশা দেন না। তাঁর capability approach-ও বাস্তবে কীভাবে সব সক্ষমতাকে পরিমাপ ও তুলনা করা হবে, সে প্রশ্ন পুরোপুরি সহজ করে না।

কিন্তু সম্ভবত এটাই তাঁর প্রকল্পের স্বভাব। তিনি আরেকটি ইউটোপিয়া নির্মাণ করতে চান না। তিনি মনে করেন, মানুষের জীবন এত বৈচিত্র্যময় এবং সমাজ এত বহুমাত্রিক যে একটি মাত্র তত্ত্ব দিয়ে তার ন্যায়সংগত বিন্যাস নির্ধারণ করা বিপজ্জনক সরলীকরণ হতে পারে।

তিনি বরং আমাদের একটি নৈতিক অভ্যাস শেখাতে চান—তুলনা করা, প্রশ্ন করা, শুনতে শেখা এবং নিজের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে দাঁড়ানো।

এই কারণেই তাঁর চিন্তায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ন্যায়ের চূড়ান্ত সংজ্ঞার চেয়ে কখনো কখনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীকে পুরোপুরি ন্যায়সংগত করার কোনো নিশ্চিত সূত্র আমাদের হাতে না থাকলেও আমরা জানি, ক্ষুধা কমানো ভালো; শিশুর শিক্ষা বাড়ানো ভালো; নারীর স্বাধীনতা বাড়ানো ভালো; রাজনৈতিক নিপীড়ন কমানো ভালো; মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বাড়ানো ভালো।

অর্থাৎ ন্যায়ের পথে এগোনোর জন্য সব সময় গন্তব্যের নিখুঁত মানচিত্রের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো আমাদের শুধু জানতে হয়—কোন পথটি কম অন্যায়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

এই ধারণাটি আজকের পৃথিবীতে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রযুক্তির বিস্ফোরণ ঘটেছে, অর্থনীতি বিশ্বায়িত হয়েছে, কিন্তু মানুষের মধ্যে বৈষম্য রয়ে গেছে। একদিকে সম্পদের অভূতপূর্ব সঞ্চয়, অন্যদিকে খাদ্য ও চিকিৎসার অনিশ্চয়তা। একদিকে তথ্যের অসীম প্রবাহ, অন্যদিকে বহু মানুষের কণ্ঠস্বর অদৃশ্য। একদিকে রাজনৈতিক স্বাধীনতার ভাষা, অন্যদিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় গভীর বঞ্চনা।

এই বৈপরীত্যের সামনে অমর্ত্য সেনের প্রশ্নটি সরল: মানুষ আসলে কী করতে পারছে?

কোনো দেশের উন্নয়নকে বিচার করতে হলে শুধু তার সম্পদ নয়, মানুষের সক্ষমতা দেখতে হবে। কোনো গণতন্ত্রকে বিচার করতে হলে শুধু নির্বাচন নয়, জনপরিসরের স্বাধীনতা দেখতে হবে। কোনো সমাজের ন্যায়বিচারকে বিচার করতে হলে শুধু তার আইন নয়, সেই আইনের বাস্তব ফল দেখতে হবে।

এখানে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মানবিক কেন্দ্রটি আবার স্পষ্ট হয়।

তিনি মানুষকে পরিসংখ্যানের একক হিসেবে দেখতে চান না। দরিদ্র মানুষ শুধু poverty line-এর নিচে থাকা একটি সংখ্যা নয়; সে একজন মানুষ, যার আকাঙ্ক্ষা আছে, মর্যাদা আছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আছে, স্বাধীনতার অধিকার আছে। একজন নারী শুধু gender statistic-এর একটি সংখ্যা নয়; তার নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। একজন ক্ষুধার্ত মানুষ শুধু খাদ্যঘাটতির একটি পরিসংখ্যান নয়; সে এমন একজন মানুষ, যার খাদ্যের ওপর কার্যকর অধিকার প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ থাকা উচিত।

এই মানবিকীকরণই অমর্ত্য সেনের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি।

তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের শেষ প্রশ্ন হলো না—“দেশ কত ধনী হয়েছে?” বরং—“দেশের মানুষ কতটা স্বাধীন হয়েছে?”

স্বাধীনতাও তাঁর কাছে কেবল রাষ্ট্রের বাধা না দেওয়া নয়। স্বাধীনতা মানে বাস্তব সক্ষমতা। একজন মানুষ যদি দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষা নিতে না পারে, তবে তার শিক্ষার অধিকার কাগজে থাকলেও তার বাস্তব স্বাধীনতা সীমিত। একজন নারী যদি সামাজিক নির্ভরতার কারণে নিজের চিকিৎসা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন, তবে তাঁর আইনি অধিকার থাকলেও তাঁর সক্ষমতা সংকুচিত। একজন নাগরিক যদি ভয়ের কারণে সরকারের সমালোচনা করতে না পারেন, তবে তাঁর মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার বাস্তবে দুর্বল।

এই বাস্তব স্বাধীনতার ধারণাই অমর্ত্য সেনকে আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনে অনন্য করে তুলেছে।

তাঁর কাছে অর্থনীতি ও নৈতিকতা পরস্পরের শত্রু নয়। বরং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ নৈতিক প্রশ্নকে আরও স্পষ্ট করতে পারে। একটি মজুরি কত—এটি অর্থনৈতিক প্রশ্ন; সেই মজুরি একজন মানুষকে কেমন জীবনযাপনের সুযোগ দিচ্ছে—এটি নৈতিক প্রশ্ন। খাদ্যের দাম কত—এটি বাজারের প্রশ্ন; দরিদ্র মানুষের খাদ্য পাওয়ার ক্ষমতা কত—এটি সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন। রাষ্ট্র কত ব্যয় করছে—এটি অর্থনৈতিক প্রশ্ন; সেই ব্যয় কার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে—এটি রাজনৈতিক প্রশ্ন।

এই সংযোগের কারণেই অমর্ত্য সেনের কাজ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর ধারণা উন্নয়ননীতি, দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যনীতি, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং মানব উন্নয়নের আলোচনায় ব্যবহারিক গুরুত্ব বহন করে।

তবু তাঁর সবচেয়ে গভীর উত্তরাধিকার হয়তো কোনো নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক নীতি নয়; একটি চিন্তার পদ্ধতি।

আমরা যখন কোনো সামাজিক ব্যবস্থা দেখি, তিনি যেন প্রশ্ন করেন—এর ভেতরে কে অদৃশ্য? কার কথা শোনা যাচ্ছে না? কার হাতে অধিকার আছে, কিন্তু তা ব্যবহার করার ক্ষমতা নেই? কার কাছে সম্পদ আছে, কিন্তু স্বাধীনতা নেই? কার জীবন অন্যের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল? আর আমরা যদি অন্যের জায়গায় থাকতাম, তাহলে কি এই একই ব্যবস্থা ন্যায়সংগত বলে মনে করতাম?

এই প্রশ্নগুলো সহজ নয়। কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতি অনেক সময় সহজ উত্তরের মধ্য দিয়ে নয়, কঠিন প্রশ্নের মধ্য দিয়েই ঘটে।

অমর্ত্য সেনের চিন্তার সৌন্দর্য এখানেই যে তিনি ন্যায়বিচারকে কোনো পাথরে খোদাই করা চূড়ান্ত বিধান হিসেবে দেখেন না। তাঁর কাছে ন্যায় একটি চলমান মানবিক অনুসন্ধান। আজ যে অন্যায় কমানো সম্ভব, তা কমানো; যে মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা সম্ভব, তা শোনা; যে সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব, তা বাড়ানো; যে বঞ্চনাকে প্রশ্ন করা সম্ভব, তা প্রশ্ন করা।

এই দৃষ্টিতে ন্যায়বিচার কোনো দূরবর্তী ইউটোপিয়া নয়। এটি আমাদের প্রতিদিনের সিদ্ধান্তের মধ্যে উপস্থিত। আমরা কীভাবে সম্পদ বণ্টন করি, কীভাবে শিক্ষা দিই, কীভাবে চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ি, কীভাবে দরিদ্র মানুষের সঙ্গে আচরণ করি, কীভাবে সংখ্যালঘুর অধিকার দেখি, কীভাবে নারীর স্বাধীনতাকে মূল্য দিই, কীভাবে রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করি—এসবের প্রতিটিই ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

অমর্ত্য সেন আমাদের তাই একটি বড় রাজনৈতিক শিক্ষা দেন: ন্যায়বিচার শুরু হয় মানুষের বাস্তব জীবন থেকে।

আর একটি বড় অর্থনৈতিক শিক্ষা দেন: মানুষের জীবনকে বুঝতে হলে শুধু আয় গুনলেই হয় না।

আর একটি বড় নৈতিক শিক্ষা দেন: নিজের অবস্থানকে পৃথিবীর একমাত্র অবস্থান বলে ধরে নেওয়া বিপজ্জনক।

এই তিনটি শিক্ষা মিলিয়ে তাঁর বৌদ্ধিক পরিচয় তৈরি হয়। তিনি অর্থনীতিকে মানবিক করেছেন, রাজনৈতিক দর্শনকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন এবং নৈতিক চিন্তাকে বিশ্বজনীন সংলাপের দিকে নিয়ে গেছেন।

তাই অমর্ত্য সেনকে শুধু নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ হিসেবে দেখলে তাঁর প্রকৃত পরিচয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশই দেখা হয়। তিনি অর্থনীতিবিদ, কিন্তু এমন এক অর্থনীতিবিদ যিনি ক্ষুধার মধ্যে রাজনীতি দেখেছেন। তিনি দার্শনিক, কিন্তু এমন এক দার্শনিক যিনি বিমূর্ত ন্যায়ের পাশে বাস্তব মানুষের জীবনকে দাঁড় করিয়েছেন। তিনি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, কিন্তু এমন একজন চিন্তাবিদ যিনি ক্ষমতার চেয়ে মানুষের কণ্ঠস্বরকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

আর সম্ভবত তাঁকে সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় “রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ” হিসেবে—সেই পুরোনো অর্থে, যেখানে অর্থনীতি মানুষের নৈতিকতা, স্বাধীনতা, রাজনীতি ও সামাজিক জীবনের বাইরে কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ জগত নয়।

অমর্ত্য সেনের কাছে পৃথিবীকে ভালো করার কাজটি কখনো নিখুঁত পৃথিবী নির্মাণের স্বপ্নে আটকে থাকে না। বরং প্রশ্নটি অনেক ছোট, অথচ অনেক গভীর: আজ আমরা কোন অন্যায়টি কমাতে পারি?

একজন মানুষের ক্ষুধা কমানো যায় কি?

একটি শিশুর সামনে শিক্ষার দরজা খোলা যায় কি?

একজন নারীর নিজের জীবনের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানো যায় কি?

একজন নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর জনপরিসরে পৌঁছে দেওয়া যায় কি?

একটি রাষ্ট্রকে আরও জবাবদিহিমূলক করা যায় কি?

একজন মানুষকে আরও স্বাধীনভাবে বাঁচার সুযোগ দেওয়া যায় কি?

যদি যায়, তবে সেখানেই ন্যায়ের শুরু।

অমর্ত্য সেনের চিন্তার সবচেয়ে মানবিক সৌন্দর্য সম্ভবত এই যে তিনি আমাদের নিখুঁত মানুষ বা নিখুঁত সমাজ হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে বলেন না। তিনি বলেন, অসম্পূর্ণ পৃথিবীর মধ্যেই অন্যায়কে একটু একটু করে কমানো সম্ভব। ন্যায়বিচার কোনো শেষ স্টেশনের নাম নয়; এটি চলার পদ্ধতি।

সেই চলার পথে দরকার যুক্তি, দরকার সহমর্মিতা, দরকার আত্মসমালোচনা এবং দরকার অন্যের জীবনের দিকে তাকানোর ক্ষমতা।

শেষ পর্যন্ত অমর্ত্য সেনের দর্শন যেন আমাদের একটি আয়না হাতে তুলে দেয়। সেই আয়নায় আমরা শুধু পৃথিবীকে দেখি না; নিজেদেরও দেখি। আমাদের সম্পদ, আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের সুবিধা, আমাদের বিশ্বাস এবং আমাদের নীরবতার দিকে তাকাই। তারপর প্রশ্ন করি—এই পৃথিবী যদি আমার নয়, অন্য কারও চোখ দিয়ে দেখা হয়, তাহলে কি এটি একই রকম ন্যায়সংগত বলে মনে হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।

কিন্তু ন্যায়বিচারের পথে হয়তো সহজ উত্তর নয়, এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে জরুরি।

গ্রন্থপঞ্জি:

  1. Sen, Amartya. The Idea of Justice. Cambridge, MA: Harvard University Press, 2009.
  2. Sen, Amartya. Development as Freedom. New York: Alfred A. Knopf, 1999.
  3. Sen, Amartya. Poverty and Famines: An Essay on Entitlements and Deprivation. Oxford: Oxford University Press, 1981.
  4. Sen, Amartya. Inequality Reexamined. Cambridge, MA: Harvard University Press, 1992.
  5. Sen, Amartya. The Argumentative Indian. New York: Farrar, Straus and Giroux, 2005.
  6. Sen, Amartya. “Rational Fools: A Critique of the Behavioural Foundations of Economic Theory.” Philosophy & Public Affairs 6, no. 4 (1977): 317–344.
  7. Rawls, John. A Theory of Justice. Revised Edition. Cambridge, MA: Harvard University Press, 1999.
  8. Smith, Adam. The Theory of Moral Sentiments. 1759.
  9. Nussbaum, Martha C., and Amartya Sen, eds. The Quality of Life. Oxford: Clarendon Press, 1993.
  10. Pogge, Thomas. Realizing Rawls. Ithaca, NY: Cornell University Press, 1989.

পড়ুন এবং বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

লেখকের জন্য পাঠক সম্মানি

লেখাটি পড়ে ভালো লাগলে আপনার সামান্য অনুপ্রেরণা ও সম্মানি লেখকের সৃষ্টিশীল পথচলাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

বিকাশ নম্বর: 01833775779• সম্মানির ৭০% লেখক পাবেন, ৩০% সাইট মেইনটেনেন্স
পাঠক মন্তব্য ও পর্যালোচনা০টি
আপনার মূল্যবান মতামত বা রিভিউ দিন
অতিথি হিসেবে মন্তব্য
৫ স্টার (চমৎকার)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম পাঠক মন্তব্যটি লিখুন!
আপনিও কি আইডিয়াপত্রে লিখতে চান?

আপনার জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ, কবিতা, বইয়ের পর্যালোচনা ও সাহিত্যকর্ম প্রকাশ করতে আমাদের লেখক পোর্টালে যুক্ত হোন।

মাসুদুল হক
মহ
মাসুদুল হক

আইডিয়া সাহিত্যপত্র লেখক ও গবেষক

নির্বাচিত অংশ শুনুন
অডিওবুক পাঠ০%
বাক্য ১ / ১
আমার শপিং কার্ট
০ টি পণ্য
আপনার কার্ট খালি আছে

পছন্দের বই খুঁজে নিয়ে কার্টে যুক্ত করুন।

বইসমূহ দেখুন
পণ্যের মোট মূল্য (Subtotal):৳০
ডেলিভারি চার্জ:৳120
সর্বমোট বিল:৳০
বিস্তারিত কার্ট পেজ দেখুন →
নির্বাচিত অংশ শুনুন
অডিওবুক পাঠ০%
বাক্য ১ / ১