নীটশের দর্শন এখনো কেন প্রাসঙ্গিক
ইংল্যান্ড অর্থনীতির দেশ। ফ্রান্স শিল্প-সাহিত্যের আর জার্মান দর্শনের দেশ। ১৫ অক্টোবর ১৮৪৪ সালে প্রুশিয়ার স্যাক্সনি অঞ্চলের র্যোকেন নামের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ফ্রিডরিখ নীটশে। ছিলেন উনিশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী জার্মান দার্শনিক। লেখক, সংস্কৃতি সমালোচক ও ধ্রুপদি ভাষাতত্ত্ববিদ হিসেবেও বিশেষভাব সুপরিচিত। তাঁর বাবা কার্ল লুডভিগ নীটশে ছিলেন একজন লুথেরান যাজক এবং তাঁর মা ছিলেন ফ্রান্সিসকা নীটশে। রক্ষণশীল পরিবারে শৈশবে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পিতাকে হারানোর পর তিনি মা, বোন এবং অন্যান্য আত্মীয়ের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠেছিলেন। একটি আবাসিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও পরে তিনি বন বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মতত্ত্ব ও ধ্রুপদি ভাষাতত্ত্ব অধ্যয়ন করেন এবং জার্মানির লাইপৎসিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান। ছাত্রাবস্থায় গ্রিক ও রোমান সাহিত্য, দর্শন এবং বিশেষত প্রাচীন গ্রিক সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। পরিচয় ঘটে আর্থার শোপেনহাওয়ারের দর্শনের সঙ্গে। মাত্র ২৪ বছর বয়সে, ১৮৬৯ সালে, নীটশে সুইজারল্যান্ডের বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্রুপদি ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। এত অল্প বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া একদিকে যেমন ছিল সুখের অন্যদিকে ছিল দুঃখের। কারণ তার এ প্রতিভা তখন সহকর্মীরা সহ্য করতে পারেননি। পদে পদে হেনস্তার শিকার হওয়া নীটশে চালিয়ে গিয়েছিলেন তার দুর্দান্ত গবেষণা ও লেখালেখি। একদা তিনি অভিব্যক্তি প্রকাশে বলেছিলেন- "আপনি যখন দেখবেন আপনার পেছনে শত্রু লেগেছে তখন আপনি নিশ্চিত হবেন আপনি আসলে সঠিক পথে আছেন।" কারণ দুর্বলরা প্রতিভাকে ভয় পায়। আতংকিত হয়।
নীটশে একক, সুসংবদ্ধ দার্শনিক তন্ত্র-মন্ত্র নির্মাণ করেননি। তাঁর দর্শনের কেন্দ্রে ছিল প্রচলিত নৈতিকতা, ধর্ম, সত্য, ক্ষমতা, ব্যক্তি ও মানবজীবনের অর্থকে নতুনভাবে প্রশ্ন করে সংজ্ঞায়িত করা। প্রচলিত ধর্ম, নৈতিকতা, মানবপ্রকৃতি এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্যই আধুনিক দর্শনের ইতিহাসে নীটশে অবস্থান এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীটশের চিন্তার ওপর আর্থার শোপেনহাওয়ারের প্রাথমিক প্রভাব ছিল গভীর। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি শোপেনহাওয়ারের হতাশাবাদ থেকে অনেকটাই সরে আসেন। শোপেনহাওয়ার যেখানে জীবনের দুঃখ ও ইচ্ছাকে অতিক্রম করার দিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, নীটশে সেখানে জীবনের শক্তি, সৃষ্টিশীলতা, সংগ্রাম এবং আত্ম-অতিক্রমকে গুরুত্ব দেন। ফলে তাঁর দর্শন ধীরে ধীরে জীবন-স্বীকৃতির এক জীবনবাদী স্বতন্ত্র দর্শনে পরিণত হয়। ১৮৭২ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ The Birth of Tragedy, Human, Beyond Good and Evil, On the Genealogy of Morality ছিল বিখ্যাত গ্রন্থ।
নীটশের দর্শনসমূহ কী?
'ঈশ্বরের মৃত্যু- দার্শনিক' নীটশের বিখ্যাত ঘোষণা ছিল “ঈশ্বর মৃত” (God is dead)। এর অর্থ সরলভাবে অনেকটা বুঝে থাকবেন ঈশ্বর হয়তো মারা গেছেন। আসলে তা কিন্তু নয় বরং এটা তিনি প্রতীকিরূপে বোঝাতে চেয়েছেন। আধুনিক বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিকাশে ইউরোপীয় সমাজে খ্রিস্টীয় ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে ঈশ্বরকেন্দ্রিক বিশ্বাসের যে পূর্বের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক কর্তৃত্ব ছিল তা ক্রমান্বয়ে হারিয়ে গিয়েছে। ফলে পুরোনো বিশ্বাস আর মূল্যবোধের জায়গা ভেঙে পড়ছে, কিন্তু তার জায়গায় নতুন মূল্যবোধ এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যা মানুষকে সুসংহত করবে তার সামাজিক জীবনে। এই শূন্যতাকেই তিনি বলেছেন ঈশ্বর মৃত। 'বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও আধুনিকতার বিকাশ পুরোনো বিশ্বাসের ভিত্তিকে দুর্বল করেছে। কিন্তু পুরোনো মূল্যবোধ ভেঙে পড়ার পর নতুন মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত না হলে মানুষ নিহিলিজম বা মূল্যশূন্যতার সংকটে পড়ে। ধর্ম ও নৈতিকতার সমালোচনা
নীটশে বিশেষত তার সমাজের খ্রিস্টীয় নৈতিকতার কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, প্রচলিত নৈতিকতা অনেক সময় দুর্বলতা, বিনয়, আত্মসংযম ও আত্মত্যাগকে এমনভাবে মহিমান্বিত করেছে যে মানুষের সৃষ্টিশীল ও আত্মপ্রতিষ্ঠামূলক শক্তি দমিত হয়েছে। এবং নৈতিকতাও পরিবর্তনশীল ফলে তার যদি গতিশীলতা না থাকে তাহলে তা সংঘাত ও সংঘর্ষ তৈরি করবে।
তিনি নৈতিকতার উৎসকে স্বাভাবিক ও চিরন্তন সত্য বলে গ্রহণ না করে তার ইতিহাস, বিকাশ, উদ্ভব অনুসন্ধান করেন। তাঁর On the Genealogy of Morality গ্রন্থে তিনি দেখানোর চেষ্টা করেন যে নৈতিক মূল্যবোধেরও একটি ঐতিহাসিক ও সামাজিক উৎপত্তি রয়েছে। তবে নীটশের ধর্মসমালোচনাকে কেবল ধর্মের বিরোধিতা হিসেবে দেখলে তাঁর বক্তব্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি মূলত প্রশ্ন তুলেছিলেন কোন মূল্যবোধ মানুষকে জীবনকে গ্রহণ করতে, সৃষ্টিশীল হতে ও নিজের সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে সাহায্য করে এবং কোন মূল্যবোধ আসলে মানুষের জীবনকে দুর্বল করে?
'ধর্মীয় মিশনারি ও সাম্রাজ্যবাদ' ঊনবিংশ শতকে পুঁজিবাদের বিকাশের কারণে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঔপনিবেশিক শাসন বিস্তার লাভ করছিল, তখন খ্রিস্টান ধর্মীয় মিশনারি কার্যক্রমও ঔপনিবেশিক শাসন বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। এশিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে ‘সভ্য’ বা ‘শিক্ষিত’ করার নামে ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা প্রচার করতো। প্রভু যিশুর বাণী ছড়িয়ে দিতো। আসলে মূল লক্ষ্য ছিল জমি দখল। আফ্রিকার কেনিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি Jomo Kenyatta ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিশপ Desmond Tutu-র সাথে সম্পর্কিত। এটি আফ্রিকায় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতা ও খ্রিস্টান মিশনারিদের দ্বিমুখী ভূমিকার সমালোচনা করে একজায়গায় বলেছিলেন "তারা ( ইউরোপীয়রা) বাইবেল দিল, আর আমাদের জমি কেড়ে নিল। প্রার্থনা করার নামে চোখ বন্ধ করাতে তারা জমি দখল করে। যখন মিশনারিরা আফ্রিকায় এসেছিল, তখন তাদের কাছে ছিল বাইবেল আর আমাদের কাছে ছিল জমি। তারা বলল, আসুন আমরা প্রার্থনা করি। আমরা চোখ বন্ধ করলাম। যখন চোখ খুললাম, দেখলাম আমাদের হাতে বাইবেল আর মিশনারিদের হাতে জমি।" নীটশের ইউরোপীয় সভ্যতার পুঁজিবাদী আগ্রাসনের এই নিজেদের আত্মতুষ্টি, নৈতিক ভণ্ডামি এবং মূল্যবোধের অন্তর্নিহিত ক্ষমতার সম্পর্ককে প্রশ্ন করেছিল। তবে তাঁকে সরাসরি আধুনিক উপনিবেশবাদবিরোধী চিন্তাবিদ হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না এই কারণে যে, তাঁর লেখায় ইউরোপীয় খ্রিস্টীয় নৈতিকতা, সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা এবং প্রচলিত সভ্যতার আত্মপ্রতারণার বিরুদ্ধে অবস্থান দেখা যায়। তিনি সমালোচনা করলেও এর সমাধানের পথ টানতে পারেননি।
'প্রভু-নৈতিকতা ও দাস-নৈতিকতা অর্থাৎ God morality এবং Slave morality' নীটশে নৈতিকতার ইতিহাস ও বিকাশ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রভু-নৈতিকতা এবং দাস-নৈতিকতার ধারণা ব্যবহার করেন। তার কাছে মানুষের ঈশ্বর বিশ্বাস প্রভু-নৈতিকতায় শক্তি, সাহস, আত্মনির্ভরতা, স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও সৃজনশীলতাকে মূল্যবান গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এবং এই নৈতিকতা নিজের জীবন ও মূল্যবোধকে নিজেই নির্ধারণ করার ক্ষমতাকে গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে, Slave Morality তথা দাস-নৈতিকতা দুর্বলতা, বিনয়, আনুগত্য, আত্মসংযম ও সহিষ্ণুতার মতো গুণকে নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ বলে প্রতিষ্ঠা করে। নীটশের মতে, যারা সমাজে নিজেদের শক্তিহীন ও পরাধীন মনে করে, তারা শক্তিমানদের প্রতি প্রত্যক্ষ প্রতিরোধ করতে না পেরে তাদের বিরুদ্ধে সঞ্চারিত ক্ষোভ পোষণ করে। এই দমিত ক্ষোভ থেকেই এমন এক নৈতিকতার জন্ম হয়, যা শক্তি ও আত্মপ্রতিষ্ঠাকে নিন্দা করে এবং দুর্বলতাকে গুণে পরিণত করে। নীটশে এই দমিত ক্ষোভকে দাস-নৈতিকতার বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন।
'ক্ষমতার ইচ্ছা' নীটশের দর্শনের আরেকটি ধারণা হলো ক্ষমতার ইচ্ছা। তাঁর মতে, মানুষের জীবনকে শুধু বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। জগতে প্রতিটি মানুষ, মানুষের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করা, নিজের সীমাকে অতিক্রম করা, শক্তি ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো এবং নিজের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার একটি গভীর আকাঙ্ক্ষায় কাজ করে। ক্ষমতার ইচ্ছা বলতে তাই কেবল অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা বোঝায় না; বরং এটি আত্মপ্রতিষ্ঠা, আত্মবিকাশ, সৃষ্টিশীলতা এবং ক্রমাগত আত্ম-অতিক্রমের শক্তি। নীটশের কাছে জীবন কোনো স্থির অবস্থায় পৌঁছে যাওয়ার বিষয় নয়; জীবন হলো নিজেকে অতিক্রম করে ক্রমাগত নতুন ও উচ্চতর সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক সৃজনশীল প্রবহমান প্রক্রিয়া।
'অতিমানব' নীটশের অতিমানব ধারণা তাঁর দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ। সাধারণভাবে অতিমানব বলতে কোনো শারীরিকভাবে শ্রেষ্ঠ মানুষ, শক্তিশালী মানুষ, স্বৈরশাসক কিংবা অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তারকারী ব্যক্তিকে আমরা বুঝি। কিন্তু কান্ট তা বোঝাতে চান নি। অতিমানব হলো এমন এক ব্যক্তি, যে প্রচলিত মূল্যবোধ ও নৈতিক বিধানকে অন্ধভাবে অনুসরণ না করে সেগুলোকে বিচার-বিশ্লেষণ করে এবং নিজের জীবন ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। সে নিজের অস্তিত্বের দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করে, নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করে এবং জীবনের অর্থ নিজেই নির্মাণ করে। অতিমানব তাই কোনো চূড়ান্ত বা স্থির মানব-রূপ নয়; বরং মানুষের আত্ম-অতিক্রম, আত্মনির্মাণ ও সৃজনশীলতার এক চলমান আদর্শ। নীটশের দৃষ্টিতে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার বর্তমান অবস্থায় নয়, বরং নিজেকে অতিক্রম করে আরও উচ্চতর সত্তায় পরিণত হওয়ার অবিরাম প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকে।
'পুনরাবৃত্তি ও দৃষ্টিভঙ্গি' পুনরাবৃত্তি এই ধারণার মাধ্যমে তিনি একটি গভীর চিন্তা-পরীক্ষা উপস্থাপন করেন। তিনি প্রশ্ন করেন যদি মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি আনন্দ, দুঃখ, ব্যর্থতা, সাফল্য ও সিদ্ধান্ত ঠিক একইভাবে পুনরায় বারবার ফিরে আসে, তাহলে তুমি কি সেই জীবনকে আবারও গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকবে? এই ধারণার মূল তাৎপর্য হলো নিজের জীবনকে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করা। জীবনে কেবল আনন্দ ও সাফল্য নয়, দুঃখ, ব্যর্থতা, সীমাবদ্ধতা ও বেদনাও অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই নীটশের পুনরাবৃত্তির ধারণা মানুষকে এমনভাবে জীবনকে গ্রহণ করার আহ্বান জানায়, যাতে সে নিজের সমগ্র অস্তিত্বকে কোনো অনুশোচনা ছাড়াই স্বীকার করতে পারে। ভারতীয় দর্শনে এ পুনরাবৃত্তি রোধের জন্য বৌদ্ধ দর্শন ও বাউল দর্শনের সামঞ্জস্য আছে। অপরদিকে নীটশের জ্ঞানতত্ত্বের দৃষ্টিভঙ্গিবাদ হলো মানুষের জ্ঞান সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, চূড়ান্ত ও কোনো দৃষ্টিকোণহীন অবস্থান থেকে অর্জিত হয় না। মানুষ তার নিজস্ব অবস্থান, সামাজিক অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়েই বাস্তবতাকে উপলব্ধি ও ব্যাখ্যা করে। ফলে সাধারণ মানুষের মতো কোনো একটি মাত্র দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতার ব্যাপারে নীটশে সতর্ক ছিলেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে তাঁর কাছে সব মতামত সমানভাবে সত্য; বরং কোনো বিষয়কে গভীরভাবে বোঝার জন্য বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই কারণে নীটশের দৃষ্টিভঙ্গিবাদ প্রচলিত চূড়ান্ত ও একমাত্রিক সত্যের ধারণাকে প্রশ্ন করে।
গণতন্ত্র সম্পর্কে নীটশে আধুনিক উদার গণতন্ত্র এবং সমতাবাদী নৈতিকতার কঠোর সমালোচক ছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, সমতার নামে ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য, উৎকর্ষ, সৃষ্টিশীলতা ও আত্মবিকাশের আকাঙ্ক্ষা কখনো কখনো দমন করা হতে পারে। যেমন কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে তা পরিলক্ষিত হয়।
তবে নীটশকে সরলভাবে গণতন্ত্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করলে তাঁর জটিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চিন্তাকে অতিরিক্ত সরলীকরণ করা হয়। তিনি বিশেষভাবে গণতান্ত্রিক সমাজের সঙ্গে যুক্ত সমতার নৈতিক আদর্শ, জনমতের প্রভাব এবং দলের নৈতিকতার সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর উদ্বেগ ছিল, ব্যক্তি যেন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রচলিত মূল্যবোধের কাছে নিজের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীন বিচারবোধ হারিয়ে না ফেলে, বিক্রি করে না দেয়। তাঁর সমালোচনার কেন্দ্রে ছিল এমন এক সমাজব্যবস্থার বিরোধিতা, যেখানে ব্যক্তির সৃজনশীল ও আত্মনির্মাণের শক্তির পরিবর্তে অভিন্নতা ও সংখ্যাগরিষ্ঠের মূল্যবোধকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নীটশের দৃষ্টিভঙ্গি
নীটশে আধুনিক ইউরোপের মূল্যবোধগত সংকট সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। যা এখনো প্রাসঙ্গিক। তাঁর মতে, পুরোনো ধর্মীয় ও নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়লে ইউরোপ একটি গভীর মূল্যবোধের সংকটের মুখোমুখি হতে পারে। এর ফলে নিহিলিজম, অর্থহীনতার অনুভূতি এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জীবনের শেষ দিকে ১৮৮৯ সালের জানুয়ারি মাসে ইতালির তুরিনে অবস্থানকালে নীটশে গুরুতর মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হন। এরপর তাঁর মানসিক ও শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তিনি স্বাভাবিকভাবে তাঁর দার্শনিক কাজ চালিয়ে যেতে পারেননি। জীবনের শেষ পর্যায়ে তাঁর মা এবং পরে তাঁর বোন এলিজাবেথ নীটশে তাঁর দেখাশোনা করেন। জীবনের শেষ বছরগুলো তিনি গুরুতর মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতার মধ্যে কাটান। আগের মতো লেখালেখি বা বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারেননি। ফ্রিডরিখ নীটশে ১৯০০ সালের ২৫ আগস্ট জার্মানির ভেইমারে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৫ বছর। পরবর্তীকালে তাঁকে তাঁর জন্মস্থানে সমাধিস্থলে সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দর্শনের প্রভাব আরও বিস্তৃত হয় এবং বিংশ শতাব্দীর দর্শন, সাহিত্য, মনোবিজ্ঞান, সংস্কৃতিচিন্তা ও রাজনৈতিক তত্ত্বে তাঁর চিন্তা এখনো গভীর প্রভাব বিস্তার করে আছে।
লেখক পরিচিতি:
মনির হোসেন
প্রভাষক
বাংলা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।










পাঠক মন্তব্য ও পর্যালোচনা০টি
আপনার মূল্যবান মতামত বা রিভিউ দিন
অতিথি হিসেবে মন্তব্য